পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ ছুটির কারণে এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক আগেই ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন নগরবাসী। ফলে শেষ মুহূর্তের চাপ তুলনামূলক কম থাকায় অনেক যাত্রী নির্বিঘ্নে নিজ নিজ গন্তব্যে যেতে পারছেন।
তবে এর মধ্যেও পুরোপুরি স্বস্তি নেই। বিশেষ করে বাস ভাড়া এবং নির্ধারিত গন্তব্যে যাত্রী না নামানোর অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন পরিবহনের বিরুদ্ধে।
পরিবহন কর্তৃপক্ষের দাবি, এখন যে যাত্রীরা আসছেন বেশীরভাগই এডভান্স টিকেট কেটেছেন। বাসের সব সিট ইতিমধ্যে বুকড হয়ে আছে। তাই বাইরের যাত্রী তুলনামূলক কম। তাই তারা নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত কোনো অর্থও নিচ্ছে না।
কিন্তু যাত্রী ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অপরিকল্পিত রুট ব্যবস্থাপনা, ভাড়া নির্ধারণে অসামঞ্জস্য এবং শ্রমিকদের চুক্তির আওতায় না আনার কারণে প্রতি বছরই ঈদযাত্রায় এ ধরনের হয়রানি দেখা দেয়।
কীভাবে হচ্ছে হয়রানি
অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত মুনাফার আশায় স্বল্প পাল্লার বাসগুলোকে দূরপাল্লার রুটে চালানো হচ্ছে। এতে ওই বাসের শ্রমিকদের দিয়ে দালালি করিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ফলে নিকটবর্তী জেলার যাত্রীরা বাধ্য হচ্ছেন দূরপাল্লার টিকিট কিনতে।
এমনই এক যাত্রী মাগুরার বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রতি বছর গাবতলী থেকে প্রায় ৪০০ টাকায় মাগুরা যাতায়াত করেন। কিন্তু এবার তাকে জানানো হচ্ছে, মাগুরা যেতে হলে খুলনা পর্যন্ত টিকিট কাটতে হবে, যার ভাড়া ৮০০ টাকারও বেশি।
মিরপুরের বাসিন্দা আমেনা ইসলাম দুই শিশু কন্যা ও স্বামীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যশোরে যাচ্ছেন। ছুটি কবে শুরু হবে তা অনিশ্চিত থাকায় আগে থেকে টিকিট কাটতে পারেননি। বাস কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে টিকিট পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন যশোরের টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে তাকে সাতক্ষীরা রুটের বাসে ১২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। আমেনা ইসলামের অভিযোগ, রুট পারমিট ও ভাড়া কাঠামোর জটিলতা কাজে লাগিয়ে পরিবহন মালিকরা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন।
গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে বিআরটিএ টাঙানো তথ্য অনুযায়ী, গাবতলী থেকে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ মিলিয়ে প্রায় ৬০টি রুট রয়েছে। এর মধ্যে যশোর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও মাগুরাগামী যাত্রীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, বগুড়ার নির্ধারিত ভাড়া ৫০০ টাকা। কিন্তু লালমনিরহাটগামী বাসে উঠলে বগুড়ার জন্য ভাড়া দিতে হচ্ছে ৯৮০ টাকা, কুড়িগ্রাম রুটে ৯৯০ টাকা, গাইবান্ধা রুটে ৭৬০ টাকা, রংপুর রুটে ৮৭০ টাকা, ঠাকুরগাঁও রুটে ১০৮০ টাকা এবং পঞ্চগড় রুটে ১১৮০ টাকা।
একইভাবে যশোরের ভাড়া ৭২০ টাকা হলেও খুলনা রুটে গেলে ৮৩০ টাকা, বাগেরহাট রুটে ৯৩০ টাকা, কালীগঞ্জ রুটে ১০৩০ টাকা, সাতক্ষীরা রুটে ৯৬০ টাকা এবং বেনাপোল রুটে ৭৭০ টাকা দিতে হচ্ছে।
বুয়েটের ট্রান্সপোর্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পাশ করা জহিরুল ইসলামের মতে, বাস ভাড়া জেলাভিত্তিক হওয়া উচিত। একাধিক রুট থাকলে ৫০ থেকে ১০০ টাকার পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু এর বেশি পার্থক্য যাত্রী হয়রানির শামিল।
ভাড়া সংক্রান্ত হয়রানি এখানেই শেষ নয়। সাধারণত বড় ও প্রতিষ্ঠিত পরিবহন কোম্পানিগুলো সরাসরি অতিরিক্ত ভাড়া নেয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে টিকিট বুকিংয়ের সুবিধা রয়েছে। তবে যেহেতু পরিবহন শ্রমিকদের বেশিরভাগই চুক্তির আওতায় নেই এবং তারা ঈদ বোনাস বা অতিরিক্ত সুবিধা পান না, তাই অনেক ক্ষেত্রে স্টাফরা যাত্রীদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা ‘সার্ভিস চার্জ’ হিসেবে আদায় করছেন। এতে টিকিট নিশ্চিত থাকার পরও যাত্রীরা বাড়তি অর্থ দিতে বাধ্য হয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন।
উত্তরবঙ্গের রংপুর রুটের হানিফ এন্টারপ্রাইজের এক সুপারভাইজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঈদে অন্যান্য পেশায় বোনাস দেওয়া হলেও পরিবহন শ্রমিকদের জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে অতিরিক্ত ১০০ টাকা নেওয়াকে তারা অস্বাভাবিক মনে করেন না।
অন্যদিকে, স্বল্প পাল্লার ও অপ্রচলিত পরিবহনগুলোতে দালালচক্র সক্রিয় থাকায় যাত্রীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে।
শৈলকূপা ডিলাক্সের টিকিট বিক্রেতা মো. রিয়াদ জানান, গাবতলীতে তাদের একাধিক কাউন্টার থাকা সত্ত্বেও অনেক যাত্রী দালালের মাধ্যমে টিকিট কেনেন। দালালরা অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার পর যখন যাত্রীরা প্রকৃত ভাড়া জানতে পারেন, তখন কাউন্টারে এসে বিতর্কে জড়ান।
দালালদের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সারা বছর তারা আমাদের জন্য যাত্রী জোগাড় করে। ঈদের সময় তাদের বাদ দিলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এই ব্যবস্থাটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয় না।’
ফরিদপুর রুটের গোল্ডেন লাইন পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা আরিফ জানান, সারা বছর তারা ৪০০ টাকায় যাত্রী পরিবহন করলেও নতুন তালিকায় ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮৫ টাকা, যা তাদের জন্য লোকসান। এছাড়া ফরিদপুর থেকে ফেরার পথে বাস খালি আসতে হয়। এ কারণে তারা ওই রুটে বাস কমিয়ে দিয়ে তুলনামূলক লাভজনক বরিশাল রুটে বেশি বাস পরিচালনা করছেন।
ভাড়ার সমস্যা নেই, স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা বলছে সরকার
হানিফ এন্টারপ্রাইজের উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের ম্যানেজার মো. হুমায়ুন কবির জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রানির কোনো অভিযোগ তারা পাননি। তিনি দাবি করেন, বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে তারা এক টাকাও অতিরিক্ত আদায় করেন না।
গাবতলীতে নাবিল পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, দেশ ট্রাভেলস ও এসবি পরিবহনসহ আরও কয়েকটি পরিবহনের সঙ্গে কথা বললেও একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তারা নির্ধারিত ভাড়ার মধ্যেই যাত্রী পরিবহন করছেন এবং অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।
এদিকে যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে ভিজিল্যান্স ক্যাম্প স্থাপন করেছে বিআরটিএ।
বিআরটিএর সহকারি পরিচালক ও গাবতলী ভিজিল্যান্স ক্যাম্পের ইনচার্জ মইনুল হাসান বলেন, কিছু অভিযোগ এলেও বুধবার পর্যন্ত ভাড়া সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভাড়া সংক্রান্ত বিভ্রান্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ভিন্ন ভিন্ন রুট দিয়ে একই জেলায় পৌঁছানো হয় বলে প্রতিটি রুটের জন্য আলাদা ভাড়া নির্ধারিত থাকে। কোনো নির্দিষ্ট রুটে টিকিট না পেলে যাত্রীরা অন্য রুটের বাসে উঠছেন, ফলে ভাড়ার তারতম্য হচ্ছে। এই বিষয়টি অনেক যাত্রী বুঝতে না পারায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে অধিকাংশ যাত্রী লিখিত অভিযোগ না দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আজ বুধবার (১৮ মার্চ) সকাল ১১টার দিকে গাবতলী বাসস্ট্যান্ড পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, সব বাস কাউন্টার থেকে নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত যাত্রী ভোগান্তির কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, কোথাও যানজট নেই এবং বাসগুলো সময়মতো ছেড়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও ২০ থেকে ৩০ টাকা কম নিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য সেখানে পুলিশ বুথ রয়েছে এবং কেউ অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক। যাত্রীরা শৃঙ্খলার সঙ্গে ঢাকা ছাড়তে পারছেন এবং কোথাও বড় ধরনের বিঘ্নের খবর পাওয়া যায়নি।