বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস পূর্ণ করেছেন তারেক রহমান। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পর মাত্র এক মাসে সরকার পরিচালনায় তার সক্রিয়তা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন—প্রথম মাস ‘আশাব্যঞ্জক’ হলেও সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেন তিনি।
দ্রুত পদক্ষেপে ‘অ্যাকটিভ’ শাসনের ইঙ্গিত
সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রথম ২৮ দিনে মোট ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা—প্রায় সব খাতকেই স্পর্শ করেছে।
সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি, যার আওতায় হাজারো পরিবারকে মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক সম্মানী চালু এবং দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিশ্চিতকরণ এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগও নেয় সরকার। বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রশাসনিক সংস্কারে নতুন বার্তা
প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক সংস্কারে বেশ কিছু প্রতীকী কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি নিজে শনিবার অফিস করা শুরু করেন এবং কর্মকর্তাদের সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশ দেন।
এছাড়া ভিভিআইপি প্রটোকল কমানো, অপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদর্শন বন্ধ করা এবং বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সীমিত করার মতো সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
এ সময়ে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে—সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, যা সরকারি ব্যয় কমানো এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে অগ্রগতি
শিক্ষা খাতে পুনঃভর্তি ফি বাতিল, ভর্তি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এবং শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা তরুণদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য খাতে ই-হেলথ কার্ড চালু এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযানও জোরদার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা খাতে চাঁদাবাজি দমন, ধর্ষণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ এবং নারীর নিরাপত্তায় ‘পিংক বাস’ চালুর নির্দেশও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সমালোচনা ও বিতর্ক
তবে সব পদক্ষেপই যে প্রশংসিত হয়েছে তা নয়। সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। বিরোধী মত ও বিশ্লেষকদের একটি অংশ এসব সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিকীকরণ’ হিসেবে দেখছেন।
এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর অর্থায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ ও বিভিন্ন ভাতা কর্মসূচি রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল্যায়ন
বিএনপির শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম এক মাসকে ইতিবাচক ও সফল হিসেবে তুলে ধরছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুরুর গতি আশাব্যঞ্জক হলেও সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, প্রথম মাসেই সরকার একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে পেরেছে। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী একদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন, অন্যদিকে দলীয় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও সমানভাবে সচেতন রয়েছেন।
এদিকে, বুধবার রাতে রাজধানীর গুলশানে দলের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রীর কাজের গতিকে ‘আশাব্যঞ্জক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বিভিন্ন সময় তিনি জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক নেতার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য রয়েছে এবং তাদের তুলনা করা সমীচীন নয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নতুন হলেও তার মধ্যে কাজ করার প্রবল স্পৃহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি যে গতিতে কাজ করছেন, তা আশাবাদী হওয়ার মতো।’ একই সঙ্গে তিনি বর্তমান মন্ত্রিসভাকে ‘নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ে গঠিত একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর দল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনা বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জানান, ইতোমধ্যে এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ শুরু হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের মাধ্যমে নীতিগত কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে ঋণ পেতে শুরু করেছেন, ফলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও বাড়ছে। ‘যখন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কাজ করতে পারবে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, তখন সামগ্রিক অর্থনীতি গতিশীল হবে’—যোগ করেন তিনি। দেশের বড় জনসংখ্যাকে অর্থনীতির অন্যতম শক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এই সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
মির্জা ফখরুল দাবি করেন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপি আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বা ‘হোমওয়ার্ক’ সম্পন্ন করেছে। ‘কোথা থেকে অর্থ আসবে, কীভাবে রাজস্ব বাড়বে—এসব বিষয় মাথায় রেখেই আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি,’ বলেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দল যে বিষয়গুলোতে একমত হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে যেকোনো সিদ্ধান্ত সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমেই গ্রহণ করা উচিত বলে তিনি মত দেন। তার মতে, তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদের মধ্য দিয়েই একটি কার্যকর সংসদ গড়ে ওঠে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠছে— প্রথমত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা; দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন; তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা।
রাজনৈতিক ও নীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রথম এক মাসে ইতিবাচক কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও সামগ্রিক মূল্যায়নের জন্য আরও সময় প্রয়োজন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুলতান মাহমুদ রানা বলেন, ‘এক মাসের সময়সীমায় কোনো সরকারের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা সমীচীন নয়। তবে শুরুর দিক থেকেই পরিবর্তনের একটি প্রচেষ্টা দৃশ্যমান।’ তিনি উল্লেখ করেন, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক নজির স্থাপন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে রাজনৈতিক সংস্কার, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নে আরও মনোযোগ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই গতিশীলতা ধরে রাখতে দলীয় সমর্থন ও সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর নির্বাহী পরিচালক শিফা হাফিজা বলেন, সরকারের পদক্ষেপগুলোতে সদিচ্ছার প্রতিফলন রয়েছে। তার মতে, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি এবং ধর্ষণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, ‘এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি, যাতে মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়।’
এদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ ইতিবাচক হলেও তা টেকসই করতে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। অন্যথায়, এসব কর্মসূচি ভবিষ্যতে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
রাজনীতি বিশ্লেষক জিয়া আহমেদ বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকারকে অর্থনীতির ভিত আরও মজবুত করতে হবে। এজন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে প্রবাসে পাঠানোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।