‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ নিয়ে আলোচনা করার জন্য আগামী ৩১ মার্চ সময় নির্ধারণ করেছে জাতীয় সংসদ। রোববার (২৯ মার্চ) বিরোধীদলীয় নেতার আনা মুলতবি প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সংসদে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৬২ বিধির আওতায় জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে এ মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান বিষয়ে আলোচনা করার জন্য সংসদের কার্যক্রম স্থগিত রাখার আহ্বান জানান।
লিখিত বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ হ্যাঁ ভোট দেওয়ায় জনগণ এই বাস্তবায়ন আদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গণভোটে হ্যাঁ ভোট বিজয়ী হওয়ায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আইনিভাবে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ-উভয় হিসেবেই শপথ নিতে বাধ্য।’
মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের পর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান প্রস্তাবটিকে যৌক্তিক ও সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী প্রস্তাব। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। উভয় পক্ষ থেকেই আলোচনা হবে। আমরা আলোচনা করতে চাই।’
তিনি ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে এ বিষয়ে আলোচনার সময় নির্ধারণের অনুরোধ জানান। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আলোচনার সময় সংশ্লিষ্ট চারটি বই সংসদ সদস্যদের টেবিলে থাকা উচিত। আমরা চাই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হোক।’
পরে ডেপুটি স্পিকার বিষয়টি নিয়ে দুই ঘণ্টার আলোচনার জন্য আগামী ৩১ মার্চ তারিখ নির্ধারণ করেন, যা সেদিনের কার্যতালিকার শেষ বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় সংসদীয় বিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বিষয়টি ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমাধানের জন্য সর্বদলীয় সংবিধান কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দেন।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা কার্যপ্রণালি বিধির ৬২ ধারায় জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে আলোচনা চেয়ে নোটিশ দিয়েছেন।’
তবে তিনি যুক্তি দেন, ‘উত্থাপিত বিষয়টির জন্য এ ধরনের নোটিশ প্রক্রিয়াগতভাবে বৈধ নয়, কারণ সংবিধান সংস্কার একটি আইন প্রণয়নের বিষয়, যা মুলতবি প্রস্তাবের আওতায় পড়ে না।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘৬২ ধারায় জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে আলোচনার বিধান থাকলেও ৬৩ ধারায় বলা হয়েছে, যেসব বিষয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হয়, সেগুলো এ ধরনের আলোচনার আওতায় আনা যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিরোধী দল চাইলে ৬৮ ধারার আওতায় বিষয়টি উত্থাপন করতে পারে, যেখানে দুই ঘণ্টার আলোচনা করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘নোটিশটি নিজেই বৈধ নয়। প্রথমে বৈধ নোটিশ আসতে হবে, তারপরই আলোচনা হতে পারে। স্পিকার চাইলে নোটিশ সংশোধনের জন্য বলতে পারেন অথবা সংশোধিত আকারে তা গ্রহণ করতে পারেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, তিনি প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছেন না, বরং সংসদীয় বিধি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নিজ দলের অবস্থান তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রস্তাব করেন, সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এ কমিটি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন জমা দিতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হলেও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধন করে না। সংবিধানের যেকোনো পরিবর্তন সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে যথাযথ আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায়ই করতে হবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে, যা সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘মুলতবি প্রস্তাবের আওতায় সাধারণ হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে সংবিধানগত বিষয় নির্ধারণ করা ঠিক হবে না, বরং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। আমরা এমন একটি সংবিধান সংশোধন চাই, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষা, জুলাই আন্দোলনের চেতনা ধারণ করবে এবং সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকবে।’