দেশে হামের (মিজেলস) সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত প্রতিরোধে তৎপরতার কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই হামের টিকা দেশে আসতে পারে। সোমবার (৩০ মার্চ) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হামের সংক্রমণ হঠাৎ বাড়লেও তা মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর মহাখালীতে এক শিশুর মৃত্যুর পর বন্ধ থাকা একটি আইসিইউ ইউনিট ১৮ ঘণ্টার মধ্যে চালু করা হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড, আইসোলেশন সুবিধা ও ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, মানিকগঞ্জ ও রাজশাহীতে নতুন ভেন্টিলেটর পাঠানো হয়েছে। আরও ২০টি ভেন্টিলেটর সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থাকলেও ২০১৮ সালের পর বড় পরিসরে হামের টিকাদান অভিযান হয়নি। ফলে যেসব শিশু টিকার বাইরে ছিল বা পরে জন্ম নিয়েছে, তাদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ থেকে টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে টিকার অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ক্রয়সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই টিকা সরবরাহ শুরু হবে। টিকা দেশে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হবে। টিকা–সংক্রান্ত কমিটি ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শিশুদের টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথাও বলেছেন।
এদিকে, মন্ত্রী জানান, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, মা-শিশু স্বাস্থ্যের উন্নতিসহ স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ৫ বছরের জন্য জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি বলেন, খুব শিগগিরই এই ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন হবে। এতে ৫ জন্য সদস্য থাকবেন। মে মাসের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা দেবে তারা।
বৈঠক সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এ সময় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আগামী ৫ বছরের পরিকল্পনা, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনা করে যেসব ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি দিয়ে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে পারে সেসব নিয়ে কথা বলেছেন। এর পাশাপাশি কারিগরি সহযোগিতারও আশ্বাস দেন তিনি।
স্বস্থ্য অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ইপিআই এর আওতায় ১২টি রোগের জন্য ৯টি টিকা প্রদান করা হয়ে থাকে: ১. যক্ষ্মা, ২. পোলিও, ৩. ডিপথেরিয়া, ৪. হুপিং কাশি ৫. ধনুষ্টংকার, ৬. হেপাটাইটিস-বি, ৭. হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি (হিব), ৮. নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া, ৯. হাম, ১০. রুবেলা, ১১. টাইফয়েড এবং ১২. হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ)।
টিকার তালিকা (৯টি টিকা): ১. বিসিজি: যক্ষ্মা প্রতিরোধ। ২. ওপিভি: পোলিও প্রতিরোধ, ৩. আইপিভি: পোলিও প্রতিরোধ, ৪. পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা: এতে ৫টি রোগের (ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি এবং হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি) প্রতিষেধক থাকে, ৫. পিসিভি: নিউমোনিয়া প্রতিরোধ, ৬. এমআর: হাম ও রুবেলা প্রতিরোধ, ৭. টিসিভি: টাইফয়েড প্রতিরোধে, ৮. টিডি: কিশোরী বা প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের জন্য ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া, ৯. এইচপিভি: জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ (নির্দিষ্ট বয়সের মেয়েদের জন্য)।
উল্লেখ্য, প্রথম ৭টি শিশুদের জন্য। বাকী ২ টা কিশোরী বা গর্ভধারণে সক্ষম মহিলাদের জন্য। এখানে টিসিভি ও এইচপিভি সম্প্রতি ইপিআই এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।