দেশে নারী বিচারকের সংখ্যা বাড়লেও থানাগুলো এখনো নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলী। তিনি বলেন, নারী কমিশন ও শিশুদের জন্য গঠিত বিভিন্ন কমিশন ভালোভাবে কাজ করলেও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে থানার পরিবেশ এখনো নারীদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক নয়।
সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত কৌশলগত পরিকল্পনা’ বিষয়ক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সালমা আলী বলেন, ‘আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে যে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে, তা দৃশ্যমান করতে হবে। বৈষম্য নিরসনে প্রতিকার, প্রতিরোধ ও আইনি পদক্ষেপ কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।’
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ গীতাঞ্জলি সিং।
সমাপনী অধিবেশনে গীতাঞ্জলি সিং বলেন, সিএসডব্লিউ-এর ৭০তম অধিবেশনসহ বিভিন্ন জাতীয় ও বৈশ্বিক আলোচনায় নারী আন্দোলন নিয়ে নানা সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক জায়গাতেই এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে না। সময়ের সঙ্গে অ্যাডভোকেসির কৌশল পরিবর্তন করতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমেছে ও সংগঠিতভাবে নারীদের পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা মোকাবেলায় নারী-পুরুষ সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, আদিবাসী, প্রান্তিক ও দলিত নারীদের বিষয়গুলো অনেক সময় আলোচনায় উপেক্ষিত থাকে। জাতিসংঘের ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাবে আদিবাসী ইস্যু অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
ডিজিটাল রাইটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ চৌধুরী বলেন, প্রযুক্তি, অধিকার ও বৈষম্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এসব বিষয় বুঝতে পারলে নারী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গত ২৪ বছর ধরে নারীর মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। নারী যত এগিয়ে যাচ্ছে, ততই নতুন প্রতিবন্ধকতা সামনে আসছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সমন্বিত কৌশল নির্ধারণ এবং সকল সংগঠনকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নীতিমালা প্রণয়ন ও তার কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান।’
উদ্বোধনী অধিবেশনে নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি সবার অংশগ্রহণে শক্তিশালী হয়। সচেতনতা ও আন্দোলন বাড়লেও নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না, তবে সম্মিলিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী কর্মশালার উদ্দেশ্য তুলে ধরে বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীর মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকার ইস্যুগুলো চিহ্নিত করা, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির শক্তি-সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ ও একটি বাস্তবসম্মত কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নই এ আয়োজনের লক্ষ্য‘’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ-সভাপতি রেখা চৌধুরী বলেন, ‘রাজনৈতিক, সামাজিক বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৯৪ সালে সম্মিলিত নারী সমাজ গঠন ও পরে ২০০২ সালে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সংগঠিত প্রচেষ্টা শুরু হয়। নারী-বান্ধব আইন প্রণয়ন হলেও দেশে এখনো আইনের শাসন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।’
কর্মশালায় বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন ও দলীয় কাজ উপস্থাপনের মাধ্যমে নারী অধিকার, বৈষম্য নিরসন ও সামাজিক প্রতিরোধ জোরদারে নানা সুপারিশ তুলে ধরেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, কর্মশালায় প্রাপ্ত মতামত ও সুপারিশ নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরও গতিশীল করবে।