বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় দেড় মাস হতে চলেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে বিশ্ব পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে, যার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র তৎপরতা বেড়েছে—প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মধ্যপ্রাচ্য সফর করছেন, সামনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর রয়েছে, এর আগে ঢাকা সফর করে গেছেন মার্কিন এক শীর্ষ কর্মকর্তা। সব মিলিয়ে জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যেই সক্রিয় কূটনৈতিক সময় পার করছে বাংলাদেশ।
এখন প্রশ্ন উঠছে, নতুন সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে কোন দিকে ঝুঁকছে—ভারত, চীন নাকি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে? আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশকে ভারত ঘনিষ্ঠ দেশ হিসেবে দেখা হতো। পরে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা শীতল হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হয়। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসায় নতুন করে এই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে কেন্দ্র করে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা হবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই হবে পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য, নির্দিষ্ট কোনো দেশকে ঘিরে নীতি নির্ধারণ করা হবে না।
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রথম বিবৃতিতে বাংলাদেশ ইরানের হামলার সমালোচনা করলেও ইরানে মার্কিন হামলার বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেনি। পরে সমালোচনার মুখে নতুন বিবৃতি দেওয়া হয়, তবে ইরানও বলেছে বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল। এর সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে করা মার্কিন বাণিজ্যচুক্তিকে সমর্থনের বিষয়টি মিলিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, বাংলাদেশ কি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে কিনা। সরকার অবশ্য এমন অভিযোগ নাকচ করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ভারত, চীন বা রাশিয়ার স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় এক দেশের প্রকল্প অন্য দেশের আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যেমন তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারত-চীন স্বার্থের দ্বন্দ্ব। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে বাংলাদেশ ভারতের কাছে অতিরিক্ত ডিজেল চেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, আবার অর্থনীতিতে চীনের বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশকে একাধিক শক্তিধর দেশের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে নির্দিষ্ট একটি দেশের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের মূল্য দিতে হয়েছে। তাই এবার সেই ভুল এড়াতে চায় বাংলাদেশ। কারণ নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের ওপর নির্ভরশীল। এক পক্ষকে বাদ দিয়ে অন্য পক্ষকে বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সরকারও বলছে, কে নাখোশ হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বাংলাদেশের স্বার্থই হবে মূল বিবেচনা। তবে বড় শক্তিধর দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, আর সেই চাপ সামলানোই এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।