দিল্লির সাউথ ব্লকের অলিন্দে এখন একটাই গুঞ্জন, ঢাকার পরবর্তী ভারতীয় হাইকমিশনার কে হচ্ছেন? বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে পাঠানোর জোরালো সম্ভাবনার মাঝে তার উত্তরসূরি হিসেবে যার নাম সবচাইতে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তিনি কোনো পেশাদার আমলা বা কূটনীতিক নন; বরং ভারতের রাজনীতির এক মহীরুহ, আরিফ মোহাম্মদ খান। যদি এই জল্পনা সত্যি হয়, তবে এটি কেবল বাংলাদেশ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হবে।
পেশাদার কূটনীতিকদের চেনা ছক ভেঙে এবার কি তবে ‘রাজনৈতিক জুয়া’ই খেলছে দিল্লি? দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ঢাকার গুরুত্ব যখন সবচাইতে স্পর্শকাতর মোড়ে, ঠিক তখনই ভারতের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নাম ভাসছে ঝানু রাজনীতিক ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আরিফ মোহাম্মদ খানের। ভারতের রাজনীতির এক চতুর খেলোয়াড় তিনি। দীর্ঘ কয়েক দশকের আমলাতান্ত্রিক কূটনীতির প্রথা ভেঙে কেন একজন পোড়খাওয়া রাজনীতিককে বাংলাদেশের ডেরায় পাঠানোর তোড়জোড় চলছে, তা নিয়ে এখন ঢাকা ও দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে শুরু হয়েছে তোলপাড়। প্রণয় ভার্মার সম্ভাব্য বিদায় আর আরিফ খানের আগমনের এই গুঞ্জন কি তবে দুই দেশের সম্পর্কে কোনো বড় ধরনের ‘প্যারাডাইম শিফট’-এর ইঙ্গিত?
পেশাদার আমলা বনাম ঝানু রাজনীতিক: কেন এই বদল?
সাধারণত ভারতের বিদেশ মন্ত্রক প্রতিবেশী দেশগুলোতে অভিজ্ঞ আইএফএস কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে থাকে। কিন্তু ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস নিউ এবং প্রশাসনিক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান মান্দারিনস ডটকম-এর প্রতিবেদন বলছে, এবার সেই প্রথা ভাঙতে পারে দিল্লি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের গভীরতা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেবল আমলাতান্ত্রিক যোগাযোগ দিয়ে তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
আরিফ মোহাম্মদ খান ৪০ বছর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রী ছিলেন। তিনি ভারতের একটি রাজ্যের সদ্য সাবেক রাজ্যপাল। রাজ্যপাল বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মতো ‘হেভিওয়েট’ প্রোফাইলের কাউকে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো বিশ্ব কূটনীতিতেই বিরল। ভারত সম্ভবত ঢাকাকে এই বার্তা দিতে চাইছে যে, প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশের গুরুত্ব তাদের কাছে সর্বোচ্চ। আর এই বিশেষ সম্পর্কের দেখভালের জন্য তারা একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিককেই বেছে নিচ্ছে।
আরিফ মোহাম্মদ খান: এক চাঞ্চল্যকর রাজনীতিক
আরিফ মোহাম্মদ খানকে কেন বেছে নেওয়া হচ্ছে, তা বুঝতে হলে তার রাজনৈতিক জীবন ও দর্শনের দিকে তাকাতে হবে। আশির দশকে রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভার অত্যন্ত প্রভাবশালী এই তরুণ প্রতিমন্ত্রী একাই কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের সংসদ। ১৯৮৬ সালের শাহ বানু মামলায় সুপ্রিম কোর্টের প্রগতিশীল রায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি কট্টরপন্থার বিরোধিতা করেছিলেন। যখন রাজীব গান্ধী সরকার ভোটের রাজনীতির চাপে কট্টরপন্থীদের সঙ্গে আপস করে আইন সংশোধন করতে চাইল, তখন আরিফ খান ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে মন্ত্রিসভা ও কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন।
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের যে বীজ ওই সময় বপন করা হয়েছিল, তা তিনি চার দশক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। মুসলিম রক্ষণশীলদের উত্থানের তীব্র বিরোধী এই মানুষটি বর্তমানে বিজেপির অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং ভারতের উদারপন্থী মুসলিম সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তার মতো একজন ব্যক্তিত্বকে বাংলাদেশে পাঠানোর পেছনে দিল্লির একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক কৌশল থাকতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও কট্টরবাদবিরোধী লড়াইয়ে তার অভিজ্ঞতা একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
বাংলাদেশের লাভ নাকি ভারতের একতরফা স্বার্থ?
আরিফ মোহাম্মদ খানের মতো একজন হেভিওয়েট রাজনীতিকের নিয়োগে ভারতের লাভ স্পষ্ট, তারা তাদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর ডেরায় একজন ‘পলিটিক্যাল ফিক্সার’ পাঠাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি কতটা স্বস্তির? বিশ্লেষকরা এখানে দ্বিমুখী সম্ভাবনা দেখছেন।
১. সরাসরি দিল্লির দরবারে সংযোগ: বাংলাদেশের জন্য সবচাইতে বড় লাভ হতে পারে ‘ডিরেক্ট এক্সেস’। একজন পেশাদার কূটনীতিককে অনেক প্রোটোকল মেনে চলতে হয়, কিন্তু আরিফ খান সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের (পিএমও) আস্থাভাজন। ফলে বাংলাদেশের কোনো সংকটে বা দ্বিপাক্ষিক জটিলতায় আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এড়িয়ে সরাসরি দিল্লির শীর্ষ মহলের সিদ্ধান্ত পাওয়া সহজ হবে।
২. ভারসাম্য ও উদারপন্থার রাজনীতি: বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যখনই ধর্মীয় কট্টরবাদ বা উগ্রপন্থার ঝুঁকি তৈরি হয়, তখন আরিফ খানের মতো একজন সংস্কারপন্থী মুসলিম ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি ঢাকার উদারপন্থী সমাজ ও প্রশাসনের জন্য সহায়ক হতে পারে। তিনি কেবল একজন কূটনীতিক হিসেবে নন, বরং একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবেও বাংলাদেশের সুধী সমাজের সঙ্গে সেতুবন্ধন গড়তে পারবেন।
৩. দর কষাকষির নতুন মাত্রা: তবে শঙ্কাও আছে। একজন ঝানু রাজনীতিক যখন রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন, তখন তার দর কষাকষির ক্ষমতা পেশাদার আমলার চেয়ে অনেক বেশি হয়। বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন এবং অভ্যন্তরীণ সমীকরণগুলো তিনি একজন রাজনীতিকের চোখ দিয়ে বুঝবেন, যা দিল্লির প্রভাবকে আরও সুসংহত করতে পারে। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় দিল্লির অদৃশ্য চাপ বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করে।
ঢাকায় ভারতের বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সম্ভাব্য গন্তব্য হতে যাচ্ছে ব্রাসেলস। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি এবং বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ব্রাসেলস এখন দিল্লির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রণয় ভার্মা সেখানে চলে গেলে ঢাকার জন্য এমন একজনকে প্রয়োজন, যিনি কেবল ফাইলপত্র নয়, বরং সরাসরি দিল্লির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে যুক্ত।
আলোচনায় একজন বাংলা ভাষাভাষী দূতের নামও শোনা যাচ্ছিল। তবে আরিফ মোহাম্মদ খানের নাম আসার পর সমীকরণ বদলে গেছে। তিনি যদি আসেন, তবে তাকে সম্ভবত ভারতের কেন্দ্রীয় পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে পাঠানো হবে। এর মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সরাসরি যোগাযোগ (ডিরেক্ট একসেস টু পিএমও) আরও শক্তিশালী হবে।
সম্পর্কের ভিন্ন মাত্রা নাকি নতুন নিয়ন্ত্রণ?
আরিফ মোহাম্মদ খানের সম্ভাব্য নিয়োগ যদি বাস্তবে রূপ পায়, সেটি হবে ভারতের পররাষ্ট্র নীতির এক ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এটি প্রমাণ করবে যে, দিল্লি এখন ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। একজন এমন মানুষকে তারা প্রতিনিধি হিসেবে পাঠাতে চাইছে, যিনি কেবল একজন রাষ্ট্রদূত নন, বরং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত আস্থাভাজন এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির এক বিচক্ষণ খেলোয়াড়।
যদি সত্যিই আরিফ খান ঢাকায় পা রাখেন, তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে ঠিকই, তবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে দিল্লির প্রভাব কতটা সংহত হবে আর বাংলাদেশের স্বকীয়তা কতটা বজায় থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। মার্কিনীদের দম্ভের পতন হোক বা ভূ-রাজনীতির নতুন মোড় আসুক, আরিফ খান কি ঢাকার জন্য ‘বন্ধু’ নাকি দিল্লির ‘চাণক্য’ হয়ে আসছেন, তা সময়ই বলে দেবে।