ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দীর্ঘ অস্বস্তিকর পর্বের পর ঢাকায় নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে, আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী প্রথমবার দিল্লি সফরে গিয়েছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের ভারত সফরটি এ পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং ভারতের পক্ষও এই সফরকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাতেই ড. খলিলুর রহমান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে একান্ত বৈঠক ও নৈশভোজ করেন। পরদিন তার বৈঠক নির্ধারিত আছে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর সঙ্গে। আলোচনা হবে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, প্রত্যাহার করা বাণিজ্য সুবিধার পুনর্বহাল ও বাংলাদেশকে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহসহ বিদ্যমান চুক্তি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সফর নিয়ে প্রকাশ্য কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে ড. খলিলুর রহমান ও জয়শঙ্করের একসঙ্গে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বিমানযাত্রা—এমন বিরল কূটনৈতিক ঘটনা দুই দেশের একে অপরের গুরুত্ব বোঝার প্রমাণ। এ ছাড়া ড. খলিলুর রহমানের সফরসঙ্গী হুমায়ুন কবির ভারতের শাসক দল বিজেপির সদর দপ্তর পরিদর্শন করছেন। সেখানে তার একটি বৈঠকও রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকার রাজপথে ভারতের বিরুদ্ধে স্লোগান উঠেছিল, ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র জ্বালানো হয় এবং ভারতের বাণিজ্য সুবিধা, ভিসা কার্যক্রম সীমিত হয়। সেই উত্তেজনা কিছুটা কমলেও দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ এখনো মিশ্রিত।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তথা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ ড. শ্রীরাধা দত্তের মতে, বিএনপি সরকারের বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতি এবং স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে ভারতের জন্য বাংলাদেশের জনমতের কিছু অংশ মোকাবিলা করা প্রয়োজন। অন্যদিকে বিবিসি বাংলা বলছে, তারা জানতে পেরেছে ভারতের পক্ষ থেকে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন সম্পর্কিত ন্যারেটিভ মোকাবিলায় ঢাকায় হাইকমিশনার পদে সম্মানিত মুসলিম বুদ্ধিজীবী নিয়োগের পরিকল্পনা চলছে।
ঢাকায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী আবার বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতা নতুন নয়। তবে সম্পর্ক থেমে যায়নি; অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক নির্ভরশীলতা দুই দেশের কূটনীতিকে এগিয়ে নিয়েছে। ভারতের পক্ষেও বাংলাদেশবিরোধিতা আছে, তবু ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ বন্ধ হয়নি।
আওয়ামী লীগ ও ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও নতুন সরকারের পথে বাধা নয়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ ওয়াচার সৌমেন রায় বিবিসিকে বলেন, কূটনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই। বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত আগের সম্পর্কের সুফলকে কাজে লাগিয়ে নতুন বন্ধুত্ব গড়তে চাইবে। অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতার কারণে ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের দাবি আসতে পারে, কিন্তু তা জোরালো হবে না।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের আগমন, জনগণের ভারতবিরোধী মনোভাব এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিধানসভা নির্বাচন—সব মিলিয়ে নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কিছু সময় লাগবে। তবে মূল স্বার্থ ও কূটনৈতিক প্রয়োজনের কারণে দুই দেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।