গত পরশু সন্ধ্যায় কোর্ট থেকে বের হয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য রিকশা খুঁজছিলাম। কয়েকটা দেখার পর একটি অটোরিকশা থামালাম। উঠতে গিয়ে দেখি চালকের পাশে সাত-আট বছরের একটি মেয়ে শিশু বসে আছে। জানতে চাইলাম, শিশুটি কে? চালক বললেন, ও তার মেয়ে। আমি মজা করে বললাম, মেয়েকে ঢাকা শহর ঘুরে দেখাচ্ছেন বুঝি? উত্তরে তিনি যা বললেন, তাতে আমি নিজেই হতবাক হয়ে যাই। তিনি বললেন, ‘স্যার, তার মায়ে কাজে গেছে, বাসায় কেউ নাই। মেয়েটারে একা রাখতে ডর লাগতাছিল। তাই সঙ্গে নিয়া আসছি।’
অটোচালকের এই গল্পটির কথা বলছিলেন রাজধানীর এক আইনজীবী। কিন্তু এই গল্প শুধু একজন অটোরিকশাচালকের নয়; এটি আজকের বাংলাদেশের অসংখ্য বাবা-মায়ের আতঙ্ক, উদ্বেগ আর অনিরাপত্তার প্রতিচ্ছবি। সন্তান স্কুলে গেলে, কোচিংয়ে গেলে কিংবা বাড়ির সামনে খেলতে নামলেও এখন অনেক পরিবার দুশ্চিন্তায় থাকেন, সন্তান ঠিকভাবে ফিরবে তো?
দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ধারাবাহিক ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ, আতঙ্ক ও হতাশা তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার মাসে দেশে ১১৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ৪৬ শিশু। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে। ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে আরও তিনজনকে। নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে অন্তত দুই শিশু।
শুধু শিশু নয়, নারীদের বিরুদ্ধেও সহিংসতা বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ মে পর্যন্ত দেশে মোট ধর্ষণ মামলার সংখ্যা ২ হাজার ২৪৩। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয়, প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক পরিবার অভিযোগই করে না। অনেক ঘটনা খবরের কাগজ বা সংবাদমাধ্যমেও আসে না।
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ঢাকার মিরপুরে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। সিলেট, ঠাকুরগাঁও এবং মুন্সীগঞ্জেও শিশু ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা সামনে আসে। প্রতিটি ঘটনাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, দেশ কি দিন দিন শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে?
অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। তাদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক ধর্ষণ মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। আবার রায় হলেও তা কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে জনমনে হতাশা বাড়ে এবং অপরাধীরাও ভয় হারিয়ে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে তদন্ত দুর্বল হয়ে যায় কিংবা সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, নারীর প্রতি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি এবং অনলাইনে সহিংস ও অশ্লীল কনটেন্টের সহজলভ্যতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তারা বলছেন, শুধু কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। দ্রুত বিচার, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানো এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে সরকারও চাপের মুখে রয়েছে। বিরোধী দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের অনেকেই বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং দুর্বল বিচারব্যবস্থার কারণেই এই ধরনের অপরাধ বাড়ছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বিচার নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব ঘটনা শুধু ভুক্তভোগী পরিবারকেই ভেঙে দেয় না; পুরো সমাজের মানসিক নিরাপত্তাবোধকে ধ্বংস করে দেয়। এখন অনেক বাবা-মা সন্তানকে একা বাইরে পাঠাতে ভয় পান। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি এখনই সমন্বিতভাবে এগিয়ে না আসে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও যদি একটি শিশুকে নিরাপদে স্কুলে পাঠানো নিয়ে একজন বাবা আতঙ্কে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা আসলে কতটা নিরাপদ সমাজ গড়তে পেরেছি?