বেশ কয়েক দিন ধরে সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থান করছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা। বিএসএফ বারবার তাদের দেশ থেকে পুশইনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে। তবে ব্যর্থ হয়েও হাল ছাড়তে রাজি নন সংস্থাটির সদস্যরা। তারা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে পুনরায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অপরদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরাও নাছোড়বান্দা। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা। বিজিবির এই মিশনে কোথাও কোথাও যুক্ত হয়েছেন স্থানীয়রাও।
বিজিবি জানিয়েছে, গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ১০ বারেরও বেশি অবৈধভাবে পুশইনের অপচেষ্টা করেছে বিএসএফ।
এর মধ্যে ঝিনাইদহের যাদবপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে চার থেকে পাঁচ ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। পরে বিজিবির বাধায় তারা ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
একই জেলার সামন্তা বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের একটি প্রিজন ভ্যানে করে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জনকে আনা হয়। সীমান্তের গেট খুলে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করলে সেখানে বিজিবি ও স্থানীয় জনসাধারণের প্রতিরোধের মুখে পড়ে বিএসএফ। পরে তারা ফেরত যেতে বাধ্য হয়।
যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত এলাকায় কয়েকজন নারী-পুরুষকে পুশইনের জন্য অবস্থান করতে দেখা যায়। বিজিবির প্রতিরোধমূলক তৎপরতায় বিএসএফ তাদের সরিয়ে নিয়ে যায়।
জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতীয় অংশে প্রায় ১০ ব্যক্তিকে একত্র করে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক সতর্কতামূলক প্রস্তুতি গ্রহণ করে বিজিবি। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোয় বিএসএফের এই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের বিপরীতে বিএসএফ ক্যাম্পের কাছের তিনটি হোল্ডিং সেন্টারে এসআইআর তালিকা থেকে বাদ পড়া চারজন মুসলমানকে বাংলাদেশে পুশইনের জন্য রাখা হয়েছে বলে খবর পায় বিজিবি। পরে সেখানে কঠোর অবস্থান ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ সীমান্তের বিপরীতে ভারতের মালদাহ জেলার ইংলিশ বাজার থানার পুলিশ সদস্যরা ২২ জনকে পুশইনের জন্য বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করেছে বলে খবর পাওয়া যায়। পরে সেখানে কড়া নজরদারি অব্যাহত রেখেছে বিজিবি।
নেত্রকোনার কচুগড়া সীমান্তের বিপরীতে ভারতের আসাম রাজ্যের বলিশী গীতারাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫-২০ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যে একত্র করা হয়। সীমান্তের একটি অংশে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় এলাকাটি দিয়ে পুশইনের আশঙ্কা রয়েছে। তাই সেখানেও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।
এদিকে সিলেটের উৎমাছড়া সীমান্ত এলাকায় সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তিকে আটক করেন স্থানীয়রা। পরে তাদের বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে যাচাই-বাছাই শেষে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের ভারতে ‘পুশব্যাক’ করা হয়।
এছাড়া পঞ্চগড়ের রওশনপুর সীমান্তে বিএসএফ এক ব্যক্তিকে পুশইন করে। স্থানীয়রা তাকে আটক করে বিজিবিকে জানান। বিজিবি ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পরে তাকে ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠানো হয়।
সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা রুখে দিতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারা জানিয়েছে, সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী যেকোনো পুশইন করার প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। সীমান্তে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, এ ধরনের যেকোনো প্রচেষ্টা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) প্রতিহত করবে এবং ভবিষ্যতেও এ অবস্থান অব্যাহত থাকবে।
পুশইনের অপচেষ্টা ঠেকাতে ‘বিজিবির শক্ত ভূমিকার’ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিজিবি এটা কন্টিনিউ করবে। যতবার এটার চেষ্টা করা হবে, ততবার বিজিবি প্রতিহত করবে এবং আমরা এটা প্রতিহত করার চেষ্টা করব এবং প্রতিহত করব।’
এবিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ পুশইন ও পুশব্যাকের বিরোধিতা করছে সরকার।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে এবং সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে আছে। কোনো ব্যক্তি যদি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নাগরিক হন এবং অন্য দেশে অবস্থান করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা পাঠিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও আইনগত নিয়ম মেনে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’