দুই দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা ইলিশ উৎপাদন তিন বছর ধরে উল্টো পথে হাঁটছে। শুধু উৎপাদনই নয়, কমছে মাছটির গড় ওজনও। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মৎস্যসম্পদ নিয়ে তাই উদ্বেগ বাড়ছে গবেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে। বিবিসি বাংলা সোমবার (২২ জুন) এক প্রতিবেদনে এসব চিত্র তুলে ধরেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল এক লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন বাড়তে থাকে। প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধকরণসহ বিভিন্ন সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপের ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন পৌঁছায় পাঁচ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টনে। তবে এরপরই শুরু হয় পতন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে আসে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয় পাঁচ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে উৎপাদন পাঁচ লাখ টনেরও নিচে নেমে যেতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের ৬০ অংশই বাংলাদেশে হয়। তবে বিশ্বের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ইলিশেরই বাংলাদেশে হয় বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় দাবি করে থাকে। ফলে উৎপাদন ও আকার কমে যাওয়ার বিষয়টি অর্থনীতি ও মৎস্য খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মোচনের পর সংরক্ষণ ও উৎপাদনে নতুন অগ্রগতির আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো দিকে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ২০২১ সাল পর্যন্ত যে প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল, তা এখন ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, নদী থেকে সাগরে যাওয়ার পথে মোহনায় ব্যাপক হারে মাছ ধরা পড়ায় ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ইলিশ বা জাটকা নিধন এখনো বড় সমস্যা। নদীতে কারেন্ট জাল ব্যবহারের পাশাপাশি সাগরে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলোর বিরুদ্ধে অগভীর এলাকায় ছোট ইলিশ ধরার অভিযোগ রয়েছে। ফলে পর্যাপ্তসংখ্যক মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এর প্রভাব উৎপাদন ও গড় ওজনে পড়ছে।
এ ছাড়া নদীর নাব্যতা সংকট, দূষণ, চর জেগে ওঠায় অভিবাসন পথের ক্ষতি, প্রজনন ক্ষেত্র ও নার্সারি গ্রাউন্ডের অবনতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। গবেষকদের মতে, মিঠাপানির এলাকায় লবণাক্ততার বিস্তার ও নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়াও ইলিশের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. আনিসুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাজারে ছোট ইলিশের সংখ্যা বাড়ছে, বড় ইলিশ কমছে। এটি ইলিশের সামগ্রিক জনসংখ্যার জন্যও সতর্ক সংকেত। তার মতে, উৎপাদন ও ওজন কমার প্রকৃত কারণ দ্রুত গবেষণার মাধ্যমে চিহ্নিত করা জরুরি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় নদী ও সাগরে নজরদারি বাড়ানো, জাটকা সংরক্ষণ নিশ্চিত করা ও সাগরে অতিরিক্ত ট্রলার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের সতর্কবার্তা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের ইলিশ সম্পদ আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।