গুলশানের বাড়িটি এখন রাষ্ট্রের সম্পদ
ঢাকার গুলশান-২ এলাকার ১০৪ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বরের বিতর্কিত বাড়িটি সরকারের সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে সম্পত্তিটি অবৈধভাবে ভোগদখল করে রাখা সাবেক জাতীয় ফুটবলার ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদীকে আগামী তিন মাসের মধ্যে বাড়িটি সরকারের কাছে হস্তান্তরের চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী ইবাদত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।
জানা যায়, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই আলিশান বাড়িটি ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ হিসেবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর বিভিন্ন সময় প্রভাবশালীদের নজর পড়ে এই সম্পত্তির ওপর। হাইকোর্ট তাঁর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন, এই বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় অফিশিয়ালি অন্তর্ভুক্ত ছিল। মাঝপথে এই বাড়ির মালিকানা পরিবর্তন বা রাজউকের খাতা থেকে ব্যক্তি মালিকানায় নেওয়ার জন্য যে প্রক্রিয়া বা জাল দলিলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি ও আইনগতভাবে অবৈধ। ফলে কাগজের মারপ্যাঁচে যার নামই বসানো হোক না কেন, এটি বর্তমানেও রাষ্ট্রের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবেই গণ্য হবে।
গল্পের মোড় ঘোরে ২০২২ সালে। তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন। রিটে অভিযোগ করা হয়, সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত একটি মহামূল্যবান বাড়ি দীর্ঘদিন ধরে বেআইনিভাবে ব্যক্তিগত ভোগদখলে ব্যবহার করছেন সালাম মুর্শেদী, অথচ গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কিংবা রাজউক রহস্যজনক কারণে চুপচাপ বসে আছে! আদালতের নির্দেশে তদন্তে মাঠে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের বিশেষ টিম এই সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের বিগত তিন দশকের পুরোনো নথিপত্র এবং রাজউকের ফাইল হ্যাক ও খতিয়ে দেখে। আদালতে দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দুদক জানায়- সালাম মুর্শেদীর নামে এই প্রপার্টির মালিকানা পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে চরম জালিয়াতি, নথিপত্র গায়েব এবং আকাশচুম্বী আইনি অসংগতি!
আদালতে আবদুস সালাম মুর্শেদী নিজেকে ‘নির্দোষ ক্রেতা’ দাবি করার চেষ্টা চালিয়েছেন। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, ১৯৯৭ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যথাযথ অনুমতি নিয়েই এই সম্পত্তি কিনেছিলেন মুর্শেদী এবং তখন থেকেই তিনি সেখানে আছেন। তবে রাজউক ও গণপূর্তের লোকজন কীভাবে ভুয়া ফাইল তৈরি করে রাষ্ট্রের সম্পত্তিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখিয়েছিল, আদালতের রায়ে তা ধরা পড়েছে। যদিও সালাম মুর্শেদীর আইনি প্যানেল জানিয়েছে, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাবেন।
হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে আগামী তিন মাসের মধ্যে পুরো বাড়িটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে বুঝিয়ে দিতে হবে। এছাড়া আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই সম্পত্তির দখল বুঝে পাওয়ার বিষয়ে আদালতে প্রথম ধাপের ‘অগ্রগতি প্রতিবেদন’ জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।