সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সে আন্দোলন যে এক দফার সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেবে সেটি ২ আগস্ট পর্যন্ত অনেকেই হয়তো চিন্তা করেননি।
৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি সমাবেশের ডাক দেয়। সেই সমাবেশ থেকেই মূলত শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশে আন্দোলনকারীদের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ‘এ সরকারের কোনোভাবেই আর এক মিনিট ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করলেই হবে না; বরং খুন, লুটপাট, দুর্নীতি হয়েছে, তার বিচার হতে হবে। আমরা পদত্যাগ দিয়ে তাকে এক্সিট রুট দিতে চাই না। তাকে পদত্যাগও করতে হবে, বিচারের আওতায়ও আনতে হবে।’
ওইদিন আন্দোলনকারীরা সরকারের পতনের দাবি তুলে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করে, প্রথমে যার তারিখ ছিল ৬ আগস্ট। কিন্তু পরদিনই সেটিকে এগিয়ে ৫ আগস্ট করার ঘোষণা দেন তারা। শেষ পর্যন্ত ওই ৫ আগস্ট কারফিউর মধ্যেই ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে এবং দুপুর নাগাদ সামরিক বাহিনীর উড়োজাহাজে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
এর মধ্যেই ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে হাসিনা বিরোধী জনস্রোত যখন ঢাকায় ঢুকছিল তখন থেকেই সেনাবাহিনীর দিক থেকে বলা হচ্ছিল যে ‘আপনারা নিবৃত্ত থাকুন, শান্ত থাকুন, সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন।’
রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে বৈঠক শেষে বেলা ৪টার দিকে সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান ‘শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন।’
প্রসঙ্গত, কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগ পর্যন্ত এই সময়কালে তীব্র আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তিপ্রয়োগ ও সহিংসতায় সরকারি হিসেবেই মৃত্যুর সংখ্যা ৮০০-এর বেশি।
অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) তদন্ত প্রতিবেদনে জুলাই-অগাস্টে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনের মতো নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পতনের আগের ৭২ ঘণ্টায় কী ঘটেছিল
শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে ১৬ জুলাই নিহত হওয়ার পরই সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠতে শুরু করে।
২০২৪ সালের ১৬ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় হওয়া সহিংসতায় মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি তদন্তে হাইকোর্টের তিনজন বিচারপতির সমন্বয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিল না তারা।
জুলাইয়ের শেষ দিকে এসে আরও তীব্র হয়ে উঠে ছাত্র আন্দোলন। এর মধ্যেই সেটি ঢাকার বাইরেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১ আগস্টে আন্দোলনকারীরা ২ আগস্টের জন্য প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়।
ডেটলাইন ২ আগস্ট
কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় অন্তত ৩২ শিশু নিহত হয়েছে উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ২ আগস্ট এক বিবৃতিতে উদ্বেগ জানায় জাতিসংঘের শিশু ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
ওদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে গণমিছিল কর্মসূচি পালিত হয় ২ আগস্ট। সেদিন গণমিছিলের কর্মসূচিকে ঘিরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নিয়ে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করে। ওইদিন দুপুরের পর থেকে এই এলাকায় অবস্থান নেয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, প্রগতিশীল বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীসহ পেশাজীবীরা। তাতে যোগ দেয় নানা শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষও।
নাহিদ ইসলামসহ আন্দোলনকারীদের ছয়জন সমন্বয়ক এক বিবৃতিতে সেদিন জানান যে তাদের ঢাকার ডিবি কার্যালয়ে চাপ প্রয়োগ করে আগের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল। ওইদিনই আন্দোলনকারীরা ৩ আগস্ট সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ও ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। পাশাপাশি বিক্ষোভ মিছিল শেষে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশের ঘোষণা দেন তারা।
এইদিনই হত্যাকাণ্ডের বিচার, গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি, কারফিউ প্রত্যাহার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবিতে ঢাকায় দ্রোহ যাত্রা’ নামে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন শিক্ষক, অভিভাবক, সংস্কৃতিকর্মী, সুশীল সমাজের সদস্য ও বামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।
ওইদিন দুপুর থেকে মোবাইল নেটওয়ার্কে ফেসবুক ও টেলিগ্রাম বন্ধ করা হয়, যা প্রায় ৫ ঘণ্টা পর আবার চালু হয়।
সেদিন রাতে গণভবনে ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদেরকে পরিস্থিতি শান্ত করার নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা।
ডেটলাইন ৩ আগস্ট
এদিন সরকার পতনের এক দফা দাবি জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তারা জাতীয় সরকার গঠনের দাবিও জানায়। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গণভবনের দরজা খোলা। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেন, ‘গুলি আর সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনো সংলাপ হয় না।’
টেলিগ্রামে দেওয়া বার্তায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘'সরকারের কাছে বিচার চাওয়া বা সংলাপে বসারও সুযোগ আর নেই। ক্ষমা চাওয়ার সময়ও পার হয়ে গেছে।’
সহিংসতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিংকেনের কাছে চিঠি পাঠান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন সেনেটর ও কংগ্রেসম্যান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ও চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় বিশাল সমাবেশ হয়, যেখানে অংশ নিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। এ ছাড়া রংপুর, সিলেট, ফরিদপুর, রাজশাহী, বগুড়া, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, বরগুনা, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেটসহ দেশের অনেক স্থানে মিছিল ও সমাবেশ হয়েছিল সেদিন।
ওইদিনই শহীদ মিনারের বিশাল সমাবেশ থেকে সরকার পতনের এক দফার ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম। তিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার গঠনেরও দাবি জানান।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ৪ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করা হয়। পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে সারাদেশে জমায়েতের কর্মসূচি ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। ছাত্র-জনতার দাবি মেনে অবিলম্বে সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ওদিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ঢাকায় সেনা সদরে বিভিন্ন স্তরের সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরে আইএসপিআর থেকে দেওয়া বিবৃতিতে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে।’
ওদিকে সেদিন গণভবনে একটি অনুষ্ঠানের পর কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে আটক সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে দাবি করেন শেখ হাসিনা।
ডেটলাইন ৪ আগস্ট
অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সরকারি নির্দেশে মোবাইলে ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয় অপারেটরগুলো।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’ চলাকালে সহিংসতায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক মানুষ নিহত হন। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জে অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ১৩ জনই পুলিশ সদস্য বলে বাহিনীটি নিশ্চিত করে।
দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে সাধারণ ছাত্র-জনতার মুখোমুখি না করার আহ্বান জানান সাবেক সেনাপ্রধান ও সেনা কর্মকর্তারা। এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভুঁইয়া বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীকে অবিলম্বে সেনা ছাউনিতে ফিরিয়ে নিয়ে যেকোনো আপদকালীন সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।’
কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের এক দফা দাবিতে ডাকা অসহযোগ আন্দোলন ঘিরে জঙ্গি হামলার সতর্কতা জানিয়ে এদিন একটি বিবৃতি দেয় সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ওইদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরের নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা মহানগরসহ সব বিভাগীয় শহর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, শিল্পাঞ্চল, জেলা সদর ও উপজেলা সদরে সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হলো।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন যারা নাশকতা করছে, তারা কেউ ছাত্র না, তারা সন্ত্রাসী।’ তাদের শক্ত হাতে দমন করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ওদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকার কেমন হবে তার একটি রূপরেখা ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। ওইদিনই শাহবাগে ব্যাপক জমায়েতের মধ্যে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
শুরুতে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ পালনের কথা থাকলেও পরে সেটি একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট ঘোষণা করে আন্দোলনের নেতারা। সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সারাদেশ থেকে ছাত্র-জনতাকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান। এ ছাড়া, সারা দেশের সব জেলা, উপজেলা, গ্রামে ও পাড়া-মহল্লায় ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠন করার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম।
ডেটলাইন ৫ আগস্ট
সকাল থেকেই কারফিউয়ের মধ্যেই ঢাকার রাস্তায় মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। শিক্ষার্থীদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে আসতে থাকে মানুষ। সারাদেশে আবারও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে সরকারের ঘোষণা করা তিনদিনের সাধারণ ছুটি শুরু হয় সেদিন। বলা হয়েছিল যে, এই সময় সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বিভিন্ন এলাকায় সেনা মোতায়েন করা হয়।
এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় শহীদমিনার সংলগ্ন বকশীবাজার, রামপুরা-বনশ্রী ও বসুন্ধরাসহ ঢাকার কয়েকটি পয়েন্টে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। বিবিসির সংবাদদাতা দেখতে পান, সকালে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের সামনের সড়ক সেনা সদস্যরা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করে রাখলেও এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা তা সরিয়ে রাজলক্ষ্মীর দিকে এগিয়ে যায়।
ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় থাকা বিবিসি সংবাদদাতারা জানান, হাজার হাজার মানুষ হেঁটে, রিক্সা নিয়ে শাহবাগের দিকে যাচ্ছেন। পুরো পথে মানুষ ছাড়া অন্য কিছু চোখে পড়ছে না। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের কোনো বাধা দিচ্ছে না।
এক পর্যায়ে খবর আসে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন শেখ হাসিনা। সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে তার হেলিকপ্টারে ওঠার সময়কার ভিডিও পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিবিসি জানতে পেরেছিল, তাকে বহনকারী একটি হেলিকপ্টার ভারতের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। পরে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ‘সামরিক একটি হেলিকপ্টারে করে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা ভারতের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন।’
যদিও পরে জানা যায়, সামরিক বাহিনীর একটি উড়োজাহাজ তাদেরকে ভারতে নিয়ে গিয়েছিল। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানায়, দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
দুপুরে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন সেনাপ্রধান। ওই বৈঠক শেষে বেলা ৪টার দিকে সেনাপ্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, ‘শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে। আমরা এখন রাষ্ট্রপতির কাছে যাবো, সেখানে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করবো। আপনারা আমাদের ওপর আস্থা রাখুন।’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এখন একটি ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট গঠন করে আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করবো।’
এর পরপরই উচ্ছ্বসিত আন্দোলনকারীরা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদ ভবনের দখল নেয়। হামলার ঘটনা ঘটে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে। বন্ধ হয়ে যায় শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্যক্রম। ঢাকায় আওয়ামী লীগের একাধিক কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ঢাকার ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে অবস্থিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’ ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় থানা ও ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরেও হামলার ঘটনা ঘটে।
ওই রাতেই জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভাষণে তৎকালিন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘অনতিবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে এবং পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়া হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করবে।’
তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, তারা আগামী চব্বিশ ঘণ্টার একটি অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব করবেন এবং তাদের সমর্থিত বা প্রস্তাবিত ছাড়া কোনো সরকার তারা সমর্থন করবেন না।
১৭ দিন পর এসে ৬ আগস্ট ভোর থেকেই কারফিউ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয় আইএসপিআর।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের নিউজ আওয়ার অনুষ্ঠানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘আমার মনে হয়, তার এখানেই শেষ। আমার পরিবার এবং আমি, আমাদের যথেষ্ট হয়েছে।’