৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে লুণ্ঠিত হওয়া পুলিশের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্রের মজুদ বাংলাদেশের জননিরাপত্তাকে এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে থানা থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩৫টি মারণাস্ত্র এখনো অধরা, অন্যদিকে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের প্রভাবে নতুন করে গড়ে উঠছে দুর্ধর্ষ বাহিনী। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ‘অস্ত্র ও অপরাধী’র মেলবন্ধনকে বিশ্লেষকরা দেখছেন এক আসন্ন বিস্ফোরণ হিসেবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য ও সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশের বিভিন্ন পুলিশি স্থাপনা থেকে মোট ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো গণভবন থেকে লুট হওয়া স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি ভয়ংকর ও অত্যাধুনিক অস্ত্র।
দীর্ঘ ১৭ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো ১ হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৮৯টি গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসকল অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে চাইনিজ রাইফেল, সাব-মেশিনগান (এসএমজি), এলএমজি এবং শটগান।
উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্র এখন পেশাদার অপরাধী ও কিশোর গ্যাংয়ের হাতে। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনা দেশকে স্তম্ভিত করে দেয়। পত্রিকার পাতা খুললেই এখন নানা অপরাধের খবর সামনে এসে পড়ে:
৫ আগস্টের সরকার পরিবর্তনের পর অন্তত ৬ জন দুর্ধর্ষ শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মুক্তি এবং বিদেশে পলাতক ডনদের সমন্বয়ে দেশে নতুন করে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠছে। লুণ্ঠিত অস্ত্রের সহজলভ্যতা এই বাহিনীগুলোকে আরও বেশি প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং আইজিপি দবাহারুল আলম উভয়ই উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ত্রয়োদশ নির্বাচনকে ঘিরে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ বাড়ছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফ, কুমিল্লার সীমান্ত এবং রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও শিবগঞ্জ রুট দিয়ে নিয়মিত অবৈধ অস্ত্র দেশে ঢুকছে। নির্বাচনের আগে এই তৎপরতা আরো বেড়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে বিজিবি ৬৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে, আর র্যাব উদ্ধার করেছে ৪৮৪টি অস্ত্র। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ শুরু করেছে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’। এই বিশেষ অভিযানে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজারের বেশি লোককে গ্রেপ্তার এবং ১৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
আইজিপি বাহারুল আলম স্পষ্ট জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে লুণ্ঠিত ১,৩৩৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা না গেলে দেশে কোনোভাবেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হবে না। মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম এবং ক্রিমিনোলজিস্টরা মনে করেন, লুণ্ঠিত অস্ত্র অপরাধীদের হাতে থাকা মানেই সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। নির্বাচনের আগে এই অস্ত্রগুলো রাজনৈতিক পেশিশক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।