সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ যৌক্তিক হলেও এই অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার সক্ষমতা যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। জনপ্রশাসন সংস্কার ও সরকারি সেবায় কার্যকর জবাবদিহি ছাড়া নতুন পে-স্কেল ঘুষ-দুর্নীতির প্রিমিয়াম বৃদ্ধির অব্যর্থ হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার শঙ্কা করছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে টিআইবি বলে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পেশাগত উৎকর্ষ ও যাদের অর্থে বেতন-ভাতা দেওয়া হয়, সেই জনগণের সহজে সেবা পাওয়া নিশ্চিতে জনপ্রশাসনে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি সরকারি খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে কার্যকর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়ে সংস্থাটি বলছে, এর অন্যথা হলে নতুন পে-স্কেল ঘুষ–দুর্নীতির প্রিমিয়াম বৃদ্ধির অব্যর্থ হাতিয়ারে পরিণত হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। তবে আগের মতোই ২০টি গ্রেড রাখার কথা বলা হয়েছে। সর্বনিম্ন ধাপে বেতনকাঠামো ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। আর সর্বোচ্চ ধাপে বেতনকাঠামো নির্ধারিত ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে সুপারিশ করা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
রোববার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ইতিমধ্যে আর্থিক সংকটে ভারাক্রান্ত জনগণের ওপর। প্রস্তাব অনুযায়ী যে বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দরকার, তা অর্জনে জনগণের জন্য অর্থসংস্থানসহ আনুষঙ্গিক কোনো সুযোগ-সুবিধা সরকার তৈরি করতে পারেনি। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় এই ব্যয়ভার বহনের সক্ষমতা অর্জনের উপযুক্ত পরিবেশেরও সৃষ্টি হয়নি।
বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের যে ব্যয় বাড়বে, সে বিষয়টি সরকার ভেবে দেখেছে কি না, এমন প্রশ্ন রেখে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের সুনির্দিষ্ট চিন্তাভাবনা যদি থাকে, তাহলে তা কী এবং কোন উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব হবে, সেটা সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে।
জনগণের করের টাকায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হলেও ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মও যেন একটি বড়সংখ্যক কর্মচারীর অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, এমনটাই মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, অতীতে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই যে বেতন–ভাতা বৃদ্ধির ফলে সরকারি খাতে দুর্নীতি কমেছে। বরং যে হারে বেতন বৃদ্ধি ঘটে, তার চেয়ে বেশি হারে ঘুষসহ অবৈধ লেনদেন বাড়ে। যার বোঝা জনগণকে বইতে হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।
জনগণের ওপর অতিরিক্ত প্রয়োজনীয় অর্থের বোঝা না চাপিয়ে যদি বেতন–ভাতা বৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য উপায় সরকার বের করতে পারে, সে ক্ষেত্রেও বেতন–ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
তিনি বলেন, সরকারি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের সব পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট আইনকানুন ও বিধি প্রতিপালন বাধ্যতামূলক করা সাপেক্ষে এবারের বেতন–ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনা করলে জনগণ তা হয়তো পরীক্ষামূলকভাবে হলেও আরও একবারের জন্য মেনে নিতে পারে। যার অন্যতম পূর্বশর্ত হবে, সব পর্যায়ের সব কর্মচারীর আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব প্রতিবছর হালনাগাদ করা ও তা প্রকাশ করা।
অর্থাৎ যারা তাদের আয়-ব্যয়ের ও সম্পদবিবরণী প্রতিবছর হালনাগাদ করাসহ প্রকাশ করবেন, কেবল তাদের জন্যই উল্লিখিত শর্তাবলি পূরণ করে নির্ধারিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধি প্রযোজ্য হবে। যারা প্রকাশ করবেন না, তাদের জন্য নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে না। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান ইফতেখারুজ্জামান।