আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। নির্বাচন ঘিরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। দেশে জানুয়ারিতেই নির্বাচনী সহিংসতা বা মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির ২৮টি ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে ডিসেম্বরে এ ধরনের ২৪টি ঘটনায় নিহত হন ১০ জন।
অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে আহতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। জানুয়ারিতে ৬৪টি নির্বাচনী সহিংসতায় চারজনের মৃত্যু হয়; আহত হন ৫০৯ জন। আর ডিসেম্বরে সাতটি সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত ও ২৭ জন আহত হন। একইভাবে নির্বাচনকে ঘিরে গণপিটুনিতে গত এক মাসে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বেড়েছে অজ্ঞাত লাশ ও কারা হেফাজতের মৃত্যুর সংখ্যাও। দেশের সীমান্তে জানুয়ারিতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে ৬ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, জানুয়ারিতে গণপিটুনির শিকার ১৭ জনকে আহত অবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। গণপিটুনিতে নিহতের মধ্যে একজনকে ছিনতাই, ১০ জনকে চুরি, দুজনকে খুন, একজনকে ডাকাতি, একজনকে অনৈতিক সম্পর্ক, চারজনকে বাগ্বিতণ্ডা, একজনকে মাদক কারবার ও একজনকে চাঁদাবাজির অভিযোগে হত্যা করা হয়।
এমএসএফ মনে করে, গণপিটুনির ঘটনায় জানুয়ারিতে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে।
এমএসএফ উল্লেখ করেছে, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা এক থেকে বেড়ে চার হওয়া প্রমাণ করে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া কার্যত প্রাণঘাতী সহিংসতার দিকে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে দুষ্কৃতকারীদের হামলায় হতাহতের ঘটনাও বেড়েছে, যা রাজনৈতিক সহিংসতার নৃশংসতা বৃদ্ধির দিকটি নির্দেশ করে। নির্বাচনী সহিংসতা ছিল জানুয়ারি মাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবাধিকার সংকট।
এমএসএফ আরও জানায়, জানুয়ারিতে ৫৭টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার হয়েছে। ডিসেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ৪৮। সংস্থাটি বলছে, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া সমাজে সহিংসতা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কা জোরদার করে। এ ছাড়া কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। ডিসেম্বরে ৯ জন মারা গেলেও এ মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে ১৫ হয়েছে।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে বেড়েছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাও। জানুয়ারি মাসে প্রতিমা ভাঙচুর, বাড়িঘর ভাঙচুর, মামলাসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি। ডিসেম্বরে এ ধরনের ঘটনা ছিল চারটি। এ ছাড়া জানুয়ারি মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে দুটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এসব বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে একজন নিহত হন।
এ ছাড়া জানুয়ারিতে ২৫৭টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, যা গত মাসের তুলনায় ১৪টি বেশি। এ মাসে ধর্ষণের ঘটনা ৩৪টি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ১১, ধর্ষণ ও হত্যা তিনটি। এর মধ্যে পাঁচজন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার ৩৪ জনের মধ্যে ছয়জন শিশু, ১১ জন কিশোরী রয়েছেন। আর দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন দুজন কিশোরী ও ৯ জন নারী। ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন দুই শিশু ও এক নারী। ধর্ষণের চেষ্টা ১৯টি, যৌন হয়রানি ১৭টি, শারীরিক নির্যাতনের ৪০টি ঘটনা ঘটেছে। এ মাসে ১৩ কিশোরী, ১৯ নারীসহ মোট ৩২ জন আত্মহত্যা করেছেন। অপহরণের শিকার হয়েছেন চার কিশোরী, আর চার কিশোরী নিখোঁজ রয়েছেন।
এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেড়েছে মামলায় আসামির সংখ্যাও। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে অর্ধেকে নেমে এলেও (১৬ থেকে ৮), সরকার পতনের পর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় শেখ হাসিনাসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোয় আসামির সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে, জানুয়ারিতে নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ১২০ এবং অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ১১০ থেকে বেড়ে ৩২০ হয়েছে। এমএসএফ বলছে, এ অবস্থা আইনগত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণমামলার প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
এমএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, গণপিটুনি ও মবসন্ত্রাসের মতো ঘটনায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় দিন দিন তা বাড়ছে। ফলে হতাহতের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারে পুলিশের ভূমিকা দেখা গেলেও তাদের পরিচয় এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করার বিষয়ে নিষ্ক্রিয় অবস্থানের কারণে এ সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে। ফলে নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি প্রকট।
তিনি আরও বলেন, মানবাধিকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবনতি দেখছি আমরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনের আগে এসে রাজনৈতিক মামলায় আসামির সংখ্যা বাড়ানোতেই বেশি মনোযোগী।