নির্বাচন কমিশন (ইসি) দায়সারা নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া। পাশাপাশি তিনি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কার্যালয়ে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ এই অভিযোগ করেন। এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ড গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।’
আসিফ মাহমুদের অভিযোগ, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের জরিপের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে একটি রাজনৈতিক দল নিজেদের প্রার্থী নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ বলেন, নির্বাচনে নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে একটি নির্দিষ্ট দলের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী প্রিজাইডিং অফিসার ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আসন্ন নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয়, তবে তার দায় শুধু নির্বাচন কমিশনের নয়, ড. ইউনূস সরকারের ওপরও বর্তাবে।
এনসিপির মুখপাত্র বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন একটা গভীর খাদের মতো হয়ে গেছে। সেখানে আমাদের চিঠি গেলে সেটা আর কখনো ফেরত আসছে না, কিন্তু বিএনপির কোনো প্রার্থীকে শোকজ করলে চিঠিও দেওয়া লাগছে না, বিকেলের মধ্যে সেটা উইথড্র হয়ে যাচ্ছে। আমরা মনে করছি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ কিছু জায়গা থেকে স্পষ্টভাবে একটা দলকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। নির্বাচনে তাদের বিরোধিতা নাই, বরং নিরপেক্ষ অফিসারদের মাঠ থেকে সরিয়ে তাদের অফিসারদের সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে একজন নির্দিষ্ট প্রার্থীকে বিজয়ী করা যায়।’
এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘মাঠে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও কার্যত তাদের কোনো কাজ করতে দেওয়া হয়নি। তাদের হাত–পা বেঁধে রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ছিল রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত, ডাকাত ও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে তাদের রাস্তার চেকপোস্টে দাঁড় করিয়ে মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট ও লাইসেন্স যাচাই করানো হয়েছে, যা সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নয়। এসব কাজের জন্য ট্রাফিক পুলিশ রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনীকে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকায় দেখেছি। এবারও নির্বাচনে তাদের ভোটকেন্দ্রের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে অলস করে রাখার একটি ষড়যন্ত্র চলছে বলে আমরা মনে করি।’
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এ নেতা বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে গেলে এবং বিভিন্ন জায়গায় পথসভা করলে আমরা দেখেছি, এক–দুইটি দল এবং প্রশাসনের কেউ কেউ গণভোটে না ভোট দেওয়ার পক্ষে কার্যক্রম চালাচ্ছে। একই সঙ্গে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে—যেমন, গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিলে সংবিধানে বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম থাকবে না—এ ধরনের কথা বলা হচ্ছে।’
অন্তর্বতীকালীন সরকারের সাবেক এ উপদেষ্টা বলেন, ‘মঞ্চে উঠে তারা গণভোটের পক্ষে কথা বললেও মাঠ পর্যায়ে তাদের আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা এটাকে দ্বিমুখী ভূমিকা মনে করি, যা এক ধরনের মুনাফিকি। এই বিষয়গুলো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশের সকল নাগরিক জানতে পারেন—বিশেষ করে নির্বাচন ও গণভোটের আগে—প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অবস্থান আসলে কী।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই নির্বাচন কমিশন সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে একটি নির্বাচন আয়োজন করুক। যেহেতু এই নির্বাচন সরকারের তত্ত্বাবধানে হচ্ছে, তাই সরকারের শুধু দাঁড়িয়ে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান যেন যথাযথভাবে কাজ করে, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।’
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘যদি নির্বাচন সুষ্ঠু না হয়, তাহলে জনগণ শুধু নির্বাচন কমিশনারদের নয়, ড. ইউনূস ও তার উপদেষ্টা পরিষদকেও দায়ী করবে, যাদের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা তাদের কাছে আহ্বান ও দাবি জানাই—আপনারা জানালার ভেতর থেকে দৃশ্য দেখবেন না, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করুন।’
এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মনিরা শারমিন বলেন, ‘নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের কোনো সুরক্ষা নেই। এসব তথ্য যেকোনোভাবে লিক হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার পক্ষে ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পরিচালক ব্যাংকগুলোর কাছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের তথ্য চেয়েছেন, যা একটি দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মিল রেখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড নির্বাচনী আচরণবিধি ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিপন্থী।’
মনিরা শারমিন অভিযোগ করেন, ‘নির্বাচন কমিশন তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, পুলিশ প্রশাসন ও গণমাধ্যম ব্যবহার করে একটি দলকে সুবিধা দিতে নির্বাচন প্রভাবিত করার অপচেষ্টা চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব অপতৎপরতা বন্ধ না হলে এনসিপি ও ১১ দলীয় ঐক্যজোট রাজপথে আন্দোলনে যাবে।’