রয়টার্সের প্রতিবেদন
শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোকে রাজপথে খুব কমই দেখা গেছে। হয় তারা নির্বাচন বর্জন করেছিল, নয়তো বিরোধী পক্ষের জ্যেষ্ঠ নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ায় কোণঠাসা হয়ে ছিল। এবার ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাতে অংশ নেওয়া তরুণদের অনেকেই বলছেন, ২০০৮ সালের পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে প্রথম প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ওই সময় থেকেই শেখ হাসিনা তার ১৫ বছরের শাসন শুরু করেছিলেন।
ধারণা করা হচ্ছে, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোট শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়বে বলেও মনে করছেন অনেকেই। এ ছাড়া ৩০ বছরের কম বয়সী জেন–জি নেতৃত্বাধীন নতুন একটি রাজনৈতিক দলও (জাতীয় নাগরিক পার্টি) হাসিনাবিরোধী রাজপথের জমায়েতকে নির্বাচনী ভিত্তি হিসেবে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হওয়ার পর জামায়াতের সঙ্গে জোটে গেছে।
এবারের নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি ২৯২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে জানান, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পাওয়ার বিষয়ে তার দল আত্মবিশ্বাসী।
কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজের যৌথ জরিপে উঠে এসেছে, দেশের ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দুর্নীতি নিয়ে। এরপরই রয়েছে মূল্যস্ফীতি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শেখ হাসিনার পতনের জেরে মাসের পর মাস অচলাবস্থা দেখা গেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশটির তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন শিল্প বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারণে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশটির জন্য ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনের দেশে দুই আঞ্চলিক প্রভাবশালী রাষ্ট্র চীন ও ভারতের ভূমিকার ওপরও প্রভাব ফেলবে।
ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, ‘জনমত জরিপগুলোতে বিএনপি স্পষ্টতই এগিয়ে আছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।’
এই বিশ্লেষকের মতে, নির্বাচনের ফলাফলের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। এর মধ্যে জেন–জি ভোটারদের ভোট রয়েছে। মোট ভোটারের প্রায় এক–চতুর্থাংশ জেন–জি। নির্বাচনের ফলাফলে এসব ভোটারের পছন্দ–অপছন্দ যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে।
পরের সরকার এমন পরিবেশ নিশ্চিত করবে, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে নিজের মতপ্রকাশ এবং স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন মোহাম্মদ রাকিব নামের ২১ বছর বয়সী এক ভোটার।
বাংলাদেশজুড়ে এখন নির্বাচনী প্রচারের আমেজ। সাদা–কালো পোস্টার আর ব্যানার ঝুলছে। সড়কের পাশের দেয়ালে এবং খুঁটি আর গাছগুলো থেকে ঝুলছে বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকযুক্ত পোস্টার–ব্যানার। অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারসামগ্রীও দেখা যাচ্ছে। সড়কের আশপাশে নির্বাচনী প্রচার দপ্তর খুলেছেন প্রার্থীরা। হচ্ছে মিছিল–সমাবেশ, বাজছে ভোটের প্রচারের গান। অতীতের নির্বাচনগুলোয় এ চিত্রটা দেখা যায়নি। তখন সবখানে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকার একক আধিপত্য ছিল।
জনমত জরিপগুলো দেখাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে জয়ী না হলেও দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো ফলাফল করতে পারে। এই দল ১৯৭১ সালে ভারতের সমর্থনে পাকিস্তানের কাছ থেকে পাওয়া দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং একসময় নিষিদ্ধ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফলাফলের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। এর মধ্যে জেন-জি ভোটারদের ভোট রয়েছে। মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জেন-জি। নির্বাচনের ফলাফলে এসব ভোটারের পছন্দ-অপছন্দ যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে।
আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের বিষয়ে চীন আর ভারতের ভূমিকা কেমন হবে, সেটাও এবারের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঠিক করে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। শেখ হাসিনাকে ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং তার পালিয়ে দিল্লিতে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে বেইজিং বাংলাদেশে নিজেদের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করেছে।
যদিও বাংলাদেশে নয়াদিল্লির প্রভাব ক্রমেই ক্ষীণ হতে শুরু করেছে, তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, ভারতের সঙ্গে জামায়াতের তুলনায় বিএনপির সম্পর্কই বেশি জুতসই হতে পারে।
বিপরীতে বাংলাদেশে জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার এলে, সেটি বরং পাকিস্তানের আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। মুসলিম–অধ্যুষিত পাকিস্তান হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। জামায়াতের জেন–জি মিত্ররা বলেছেন, তাদের উদ্বেগের বড় একটি বিষয় বাংলাদেশে নয়াদিল্লির আধিপত্য। জেন–জি নেতারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী বলেছে, দলটি নির্দিষ্ট কোনো দেশের দিকে ঝুঁকবে না। বরং দলটির পক্ষ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের নিরিখে সমাজ গড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।