মানুষের আচরণ বিচার করতে আমরা প্রায়ই তাড়াহুড়ো করি। বিশেষ করে ‘ভয়’ নামক স্বাভাবিক একটি অনুভূতিকে আমরা অনেক সময় দুর্বলতা বা কাপুরুষতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। কাউকে ‘ভিতু’ বলে চিহ্নিত করা এবং সেখান থেকে তাকে ‘কাপুরুষ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া আমাদের সমাজে খুব সাধারণ একটি প্রবণতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটা কি সত্যিই ন্যায্য? একজন মানুষ ভয় পেলে কি তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাপুরুষ হয়ে যান? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের মানুষ, মন এবং আচরণের গভীরে একটু ঢুকে দেখতে হবে।
প্রথমত, ভয় পাওয়া মানুষের একটি মৌলিক ও স্বাভাবিক অনুভূতি। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য জৈবিক প্রক্রিয়া। আমাদের মস্তিষ্কের ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লড়াই বা সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। এই ভয়ই মানুষকে আগুন থেকে দূরে থাকতে শেখায়, উচ্চতা থেকে সাবধান করে কিংবা বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। সুতরাং ভয়কে নেতিবাচক কিছু হিসেবে দেখা বৈজ্ঞানিকভাবেও ভুল।
দ্বিতীয়ত, ভয় অত্যন্ত ব্যক্তিনির্ভর বিষয়। একেকজন মানুষ একেক জিনিসে ভয় পায়, এটাই স্বাভাবিক। যে মানুষ যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ভীকভাবে লড়াই করতে পারেন, তিনি হয়তো একটি তেলাপোকা দেখেই ভয় পেয়ে যেতে পারেন। এখানে তার সাহস কমে যায়নি, বরং ভয়ের ধরনটা আলাদা। একইভাবে, যে ব্যক্তি নির্দ্বিধায় মাংস খেতে পারেন, তিনি হয়তো গরু জবাইয়ের দৃশ্য সহ্য করতে পারেন না। এটি তার ভেতরের সংবেদনশীলতার বহিঃপ্রকাশ, কাপুরুষতার নয়।
একইভাবে, একজন মানুষ প্রাণীপ্রেমী হলেও কুকুর দেখলে ভয় পেতেই পারেন, এটাও একেবারেই স্বাভাবিক। প্রাণীপ্রেম মানে সব প্রাণীর প্রতি নির্ভীক আচরণ নয়, বরং তাদের প্রতি সহানুভূতির মনোভাব। অনেকেই কুকুরকে ভালোবাসেন, তাদের কষ্টে কষ্ট পান, কিন্তু হঠাৎ কোনো কুকুর সামনে এলে বা আক্রমণাত্মক আচরণ করলে ভয় পেয়ে যান। এটি কোনো দ্বিচারিতা নয়, মানুষের স্বাভাবিক সুরক্ষাবোধ। অতীত অভিজ্ঞতা, সামাজিক ধারণা বা অজানা আশঙ্কা—সব মিলিয়েই এই ভয় তৈরি হতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অনেকেই সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিতে ভয় পান, আর এই ভয়কে ঘিরেই তাদের ‘কাপুরুষ’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। একটি আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানে কেবল সাহস দেখানো নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গ্রেপ্তারের আশঙ্কা, চাকরি হারানোর ভয়, পরিবারের নিরাপত্তা, এমনকি জীবনের ঝুঁকিও। সবার সামাজিক অবস্থান, দায়-দায়িত্ব এবং ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা একরকম নয়। কেউ হয়তো ভেতরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কিন্তু বাস্তবতার চাপে সরাসরি রাস্তায় নামতে পারেন না। তাই আন্দোলনে না যাওয়াকে সরাসরি কাপুরুষতা বলা অনেক সময় অন্যায্য সরলীকরণ হয়ে যায়। সাহসের প্রকাশ একেকজনের কাছে একেক রকম। কেউ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন, কেউ লেখার মাধ্যমে, কেউ নীরবে নিজের অবস্থান ধরে রাখেন। এই ভিন্নতাকে না বুঝে একক মানদণ্ডে বিচার করলেই ভুলটা ঘটে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের উদাহরণগুলোও এই সত্যকে স্পষ্ট করে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব সাহসী, প্রতিবাদী বা দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করেন। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি অফিসে বসের সামনে গিয়ে নিজের কথা বলতে ভয় পান। এটি ভণ্ডামি নয়, সামাজিক কাঠামো, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবোধের সঙ্গে জড়িত একটি বাস্তবতা। কর্মক্ষেত্রে ভয় পাওয়ার পেছনে চাকরি হারানোর আশঙ্কা, সামাজিক অবস্থান কিংবা আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো কাজ করে, যা সম্পূর্ণ যৌক্তিক।
তৃতীয়ত, ‘ভিতু স্বভাব’ বলতে আমরা যা বুঝি, তা অনেক সময় একটি অভ্যাসগত আচরণ বা মানসিক গঠনের ফল। কেউ হয়তো ছোটবেলা থেকেই এমন পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে তাকে বারবার ভয় দেখানো হয়েছে, কিংবা ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ফলে তার মধ্যে একটি সাবধানী, কখনো কখনো অতিরিক্ত ভীতু আচরণ তৈরি হয়েছে। এটিকে কাপুরুষতা বলা মানে তার জীবনের প্রেক্ষাপটকে অস্বীকার করা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে, ভয় পাওয়া আর কাপুরুষ হওয়া এক জিনিস নয়। ভয় একটি অনুভূতি, যা সবার মধ্যেই আছে। কিন্তু কাপুরুষতা এমন একটি মানসিকতা, যেখানে মানুষ প্রয়োজনীয় সময়েও নৈতিক বা দায়িত্বশীল অবস্থান নিতে অস্বীকার করে, শুধু নিজের স্বার্থ বা নিরাপত্তার জন্য। অর্থাৎ, কাপুরুষতা একটি নৈতিক প্রশ্ন, কিন্তু ভয় একটি প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া। স্বার্থপর হওয়াও যে খারাপ, তাও অবশ্য ভুল ধারণা। এ নিয়ে অন্যদিন লেখা যাবে।
আমরা যদি প্রতিটি ভয় পাওয়া মানুষকে কাপুরুষ বলে ফেলি, তাহলে মানুষের জটিল মানসিক বাস্তবতাকেই আমরা অস্বীকার করি। বরং আমাদের উচিত বোঝার চেষ্টা করা, কেন একজন মানুষ ভয় পাচ্ছে, তার ভয়ের উৎস কী এবং সেই ভয় তাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে। সহানুভূতি ও বোঝাপড়ার জায়গা থেকে দেখলে আমরা বুঝতে পারি, ‘ভিতু’ মানুষ আসলে কাপুরুষ নন। এবং বেশিরভাগ মানুষই কোনো না কোনো কিছুতে ভয় পান। মানুষের এই সীমাবদ্ধতা, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি তো থাকবেই।
লেখক
ইশতিয়াক আহমেদ, সাংবাদিক