২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। গৌরব, ত্যাগ ও অমলিন ইতিহাসের এক দীপ্ত দিন। আজ থেকে ৫৫ বছর আগে দীর্ঘ সংগ্রাম, অসীম সাহস এবং অগণিত শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে জন্ম নিয়েছিল আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি—বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার এই দীর্ঘ পথচলায় আমরা অতিক্রম করেছি ৫৩টি বছর। কিন্তু এই সময়ের পরিক্রমায় একটি প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক—আমরা কি সত্যিই সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পেরেছি, যার ভিত্তি ছিল সাম্য, ন্যায়, মানবিকতা ও উন্নয়নের অঙ্গীকার? যে স্বপ্নের জন্য লাখো মানুষ অকাতরে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই, ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে এবং বর্তমানকে নতুন করে ভাবতে হবে।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতার লড়াই ছিল না কেবল একটি মানচিত্র বা পতাকা অর্জনের জন্য; এর অন্তর্নিহিত লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। একটি বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান হবে, যেখানে নিশ্চিত হবে ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার এবং মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা। আজ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন জাগে, সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই জাতি অন্যায়কে কখনো মেনে নেয়নি। ১৯৭১-এর পর ২০২৪ সালেও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ আবারও স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। এ সংগ্রাম কোনো ভিন্ন রাষ্ট্র বা জাতির বিরুদ্ধে ছিল না; এটি ছিল অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিরোধ। বহু প্রাণের বিনিময়ে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জনগণের অধিকার, ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা এবং মুক্তভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এই ইতিহাস এক অদম্য জাতির বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
আজ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমাদের নিজস্ব সংবিধান, মানচিত্র ও লাল-সবুজের পতাকা রয়েছে। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল কি সব নাগরিক সমানভাবে ভোগ করছে? বাস্তবতা বলছে, এখনো বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায্যমূল্য ও কর্মসংস্থান—এসব ক্ষেত্র এখনো চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। তাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা একটি দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত বাংলাদেশ।
একই সঙ্গে বারবার সামনে আসে কিছু মৌলিক প্রশ্ন—কেন কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না? কেন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়? কেন দুর্নীতি এখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার বিষয়টি। কারণ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, যেখানে স্বচ্ছতা, ন্যায় ও দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ত্যাগ আমরা কখনো ভুলবো না। সেই স্বাধীনতার ডাক না থাকলে আমরা আজও পরাধীন থাকতাম। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি মানবিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি, যা একটি সত্যিকারের স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক বিভাজন, সামরিক শাসন ও নানা অস্থিরতা আমাদের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। আজও দুর্নীতি, বেকারত্ব, মাদক, সন্ত্রাস ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তবুও বাংলাদেশ থেমে নেই। প্রতিকূলতার মধ্যেও এ দেশের মানুষ এগিয়ে চলেছে দৃঢ় প্রত্যয়ে। কারণ, প্রতিকূলতা জয় করেই এগিয়ে যাওয়ার নামই বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি শুধু একটি স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জন করেছি, নাকি একটি সত্যিকারের স্বাধীন সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং দুর্নীতি, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। স্বাধীনতা কেবল ইতিহাস নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের চর্চা ও দায়বদ্ধতা।
তাই শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; দেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের প্রতিটি নাগরিকের। নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইতিবাচক অবদান রাখার মাধ্যমেই আমরা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল করতে পারি। কারণ, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার জনগণই।
সবাইকে জানাই মহান স্বাধীনতা দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা।
লেখক: সাংবাদিক