মধ্য ভারতের গভীর জঙ্গল। মার্চের গরমে ধুলোমাখা পথ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন এক ব্যক্তি। গায়ে বিবর্ণ চেক শার্ট, পরনে পুরোনো প্যান্ট, পায়ে ক্ষয়ে যাওয়া স্পোর্টস জুতা। কাঁধে ঝুলছে একটি রাইফেল। তার মাথার ওপর পুরুষ্কার ঘোষণা করা ছিল ২৬ হাজার ডলারের!
তার নাম পাপা রাও।
তার পেছনে এক সারিতে হাঁটছে আরও ১৭ জন নারী-পুরুষ। কারও হাতে ব্রিটিশ আমলের লি-এনফিল্ড রাইফেল, কারও হাতে পুরোনো এল-ওয়ান-এ-ওয়ান অস্ত্র। কারও পায়ে স্যান্ডেল, কারও কাঁধে খেলাধুলার ব্যাগ। তাদের দেখে প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ কোথাও যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তারা ছিল বিশ্বের সর্বশেষ মাওবাদী গেরিলাদের একটি দল।
তারা যুদ্ধ করতে যাচ্ছিল না।
তারা আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছিল।
যে বিপ্লবের জন্য তাদের যৌবন কেটেছে, যে স্বপ্নের জন্য তারা দশকের পর দশক জঙ্গলে কাটিয়েছে, যে বৈষম্যের রাষ্ট্রকে উৎখাত করার জন্য অস্ত্র ধরেছিল, সেই স্বপ্নের শেষ অধ্যায়ের দিকে তারা হেঁটে যাচ্ছিল।
সেদিন শুধু কয়েকজন বিদ্রোহী আত্মসমর্পণ করেনি। সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র আন্দোলনগুলোর একটির শেষ পর্দা নামার দৃশ্যও দেখা গেল সেদিন।
দুই.
ভারতের ইতিহাসে নকশাল নামটি একসময় ভয়, রোমাঞ্চ, বিপ্লব আর রক্তক্ষয়ের সমার্থক শব্দ ছিল।
আজকের তরুণদের কাছে হয়তো শব্দটি ইতিহাসের অংশ এখন। কিন্তু কয়েক দশক আগেও ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
এই গল্পের শুরু মধ্য ভারতের জঙ্গলে নয়।
শুরু হয়েছিল হিমালয়ের পাদদেশে, পশ্চিমবঙ্গের ছোট্ট একটি গ্রাম নকশালবাড়িতে।
১৯৬৭ সাল।
ভূমিহীন কৃষকদের বিদ্রোহ। জমিদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ। ভূমি সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন খুব দ্রুত স্থানীয় ঘটনার সীমা ছাড়িয়ে যায়।
সেই সময় পৃথিবী ছিল স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপে বিভক্ত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর এই দুই শক্তির মাঝখানে বিপ্লবের আরেক প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন চীনের নেতা মাও সেতুং।
মাও বিশ্বাস করতেন, গ্রামাঞ্চলকে ঘাঁটি বানিয়ে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা সম্ভব।
ভারতের একদল তরুণ বিপ্লবী সেই দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে নামেন বিপ্লবের উত্তাল পথে।
তাদের বিশ্বাস ছিল, ভারতের গণতন্ত্র আসলে দরিদ্র, আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের জন্য কোনো ন্যায়বিচার বয়ে আনতে পারেনি। তাই পরিবর্তনের একমাত্র পথ সশস্ত্র বিপ্লব।
সেখান থেকেই জন্ম নেয় ভারতের মাওবাদী বা নকশাল আন্দোলন।
তিন.
সময় গড়ায়। বছর যেতে থাকে।
আন্দোলন দমন করা হয়, আবার ফিরে আসে।
পতাকা হাতে সাম্যের নেতারা নিহত হন, নতুন নেতা উঠে আসেন আর উচিয়ে ধরেন পতাকা।
বিভক্তি হয়, পুনর্গঠন হয়।
কিন্তু আন্দোলন থামে না।
ক্রমে মধ্য ও পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে গড়ে ওঠে তথাকথিত লাল করিডর।
ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, ওডিশা, বিহার, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ, হাজার হাজার বর্গকিলোমিটারের বিস্তীর্ণ এলাকা।
একসময় ভারত সরকারের হিসাবেই নকশালদের প্রভাব ছিল প্রায় ৯২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায়। আয়তনে যা যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সমান।
সেই অঞ্চলগুলোতে রাষ্ট্রের উপস্থিতি ছিল খুবই দুর্বল। সেখানে রাস্তা কম, হাসপাতাল নেই, স্কুল নেই, কর্মসংস্থান নেই।
কিন্তু ছিল খনিজ সম্পদ।
কয়লা, লৌহ আকরিক, বক্সাইট।
আর ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বঞ্চিত মনে করত।
সেই ক্ষোভের ভেতরেই শিকড় গেড়েছিল নকশাল আন্দোলন।
চার.
সুখমতি ধ্রুব তখন কিশোরী।
ছত্তিশগড়ের এক প্রত্যন্ত গ্রামে বড় হচ্ছিলেন তিনি।
তার স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট বন বিভাগের কর্মকর্তাদের আচরণ।
ঘর বানাতে কর।
কাঠ কাটতে কর।
অভিযোগ করলেই মারধর।
সুখমতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, গ্রামের মানুষ প্রায়ই অপমানিত হতো।
রাষ্ট্র তাদের কাছে ছিল দূরের কিছু।
কিন্তু নকশালরা ছিল আশেপাশেই।
তাদের ভাষা গ্রামের মানুষের ভাষা।
তাদের প্রতিশ্রুতি ছিল ন্যায়বিচারের। ইনসাফের।
সেই আকর্ষণেই তিনি যোগ দেন আন্দোলনে।
পাপা রাওয়ের গল্পও প্রায় একই।
দারিদ্র্য, বৈষম্য, প্রশাসনিক হয়রানি, সব মিলিয়ে একসময় তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, বন্দুকই পরিবর্তনের একমাত্র পথ।
পাঁচ.
বিপ্লবের রোমান্টিক গল্পের পেছনে ছিল ভয়ংকর বাস্তবতাও।
দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘর্ষে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে।
পুলিশ সদস্য।
সেনা সদস্য।
বিদ্রোহী।
সাধারণ মানুষ।
২০০৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঘোষণা করেছিলেন, নকশাল আন্দোলনই দেশের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি।
পরের বছর ছত্তিশগড়ে এক হামলায় ৭৬ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হন।
ঘটনাটি পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
সরকারি হিসাব বলছে, ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বামপন্থী চরমপন্থা সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
কিন্তু সংখ্যার পেছনে রয়েছে অগণিত অজানা গল্প।
অসংখ্য পরিবার।
অসংখ্য অসমাপ্ত জীবন।
ছয়.
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহু বছর ধরে অভিযোগ করেছে, সংঘাতের দুই পক্ষই নৃশংসতা করেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।
নকশালদের বিরুদ্ধে অপহরণ, হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার।
ফলে বহু গ্রামের মানুষ দুই আগুনের মাঝখানে আটকা পড়ে যায়।
কিন্তু ইতিহাসেরও বদল আছে। একসময় মোড় ঘুরে যায় তার।
যে কৌশল একসময় রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানাত, তা ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারাতে শুরু করে।
ভারতের অর্থনীতি বদলে যায়।
নতুন রাস্তা তৈরি হয়।
মোবাইল ফোন পৌঁছে যায় দুর্গম জঙ্গলেও।
বিদ্যুৎ পৌঁছায় প্রত্যন্ত গ্রামে।
রাষ্ট্র এমন জায়গায় প্রবেশ করতে শুরু করে, যেখানে একসময় শুধু নকশালদেরই কর্তৃত্ব ছিল।
একই সঙ্গে শুরু হয় বড় নিরাপত্তা অভিযান।
নতুন বাহিনী গঠন করা হয়।
ড্রোন, নজরদারি প্রযুক্তি, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, সবকিছু আরও শক্তিশালী করা হয়।
একসময় আত্মসমর্পণকারী বিদ্রোহীরাই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হয়ে ফিরে আসে।
তারা জানত জঙ্গলের পথ।
জানত গেরিলা কৌশল।
জানত কোথায় লুকিয়ে থাকে বিদ্রোহীরা।
সাত.
আজ ছত্তিশগড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেলে অন্য এক দৃশ্য দেখা যায়।
যে রাস্তা একসময় ছিল সংঘর্ষের প্রতীক, সেখানে এখন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যানার।
যে জঙ্গল একসময় ছিল গেরিলাদের নিরাপদ ঘাঁটি, সেখানে নিয়মিত টহল দেয় নিরাপত্তা বাহিনী।
বস্তারের পুলিশ কর্মকর্তা সুন্দররাজ পাত্তিলিঙ্গমের ভাষায়, সক্রিয় নকশালের সংখ্যা এখন দুই অঙ্কে নেমে এসেছে।
একসময় যাদের খুঁজে পাওয়া ছিল অসম্ভব, তারা এখন আত্মসমর্পণ করছে।
কেউ ক্লান্ত হয়ে।
কেউ হতাশ হয়ে।
কেউ বিশ্বাস হারিয়ে।
আট.
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ কি সত্যিই একটি আন্দোলনের মৃত্যু?
নাকি শুধু একটি পর্যায়ের সমাপ্তি?
সমালোচকরা বলছেন, অস্ত্রধারী বিদ্রোহ হয়তো শেষ হচ্ছে, কিন্তু যেসব কারণে এই আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, সেসব কি শেষ হয়েছে?
আদিবাসীদের ভূমির অধিকার?
খনি প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ?
দারিদ্র্য?
উন্নয়ন বৈষম্য?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নন্দিনী সুন্দর মনে করেন, রাষ্ট্র হয়তো যুদ্ধ জিতছে, কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখনও অমিমাংসিত রয়েছে।
নয়.
রাষ্ট্র ও সামাজিক বাস্তবতা অস্বীকার করা কঠিন।
আজ ভারতের কোনো রাজ্যে কমিউনিস্ট বা মার্ক্সবাদী দল ক্ষমতায় নেই।
জঙ্গলের ভেতরে মাওবাদী ঘাঁটিগুলো ভেঙে পড়ছে।
আত্মসমর্পণকারীদের সংখ্যা বাড়ছে।
আর বিপ্লবের পুরোনো স্বপ্ন ক্রমশ ধূসর ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিচ্ছে।
সেদিন আত্মসমর্পণের আগে একটি গাছের নিচে বসে ছিলেন পাপা রাও।
রাইফেলটি গাছের কাণ্ডে ঠেস দিয়ে রাখা ছিল তার।
আহা! কত প্রিয় এক সঙ্গী!
অদ্ভুত এক দৃশ্য।
বন্দুকের নলের সঙ্গে ঝুলছে একটি ছোট ব্রেসলেট।
তাতে লেখা মাত্র একটি শব্দ—
‘শান্তি’।
যে মানুষটি জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন যুদ্ধের মধ্যে, তার অস্ত্রেই ঝুলছিল শান্তির বার্তা।
হয়তো সেটিই ভারতের মাওবাদী বিদ্রোহের শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে শক্তিশালী এক প্রতীক।
ছয় দশকের লাল বিপ্লব, হাজারো প্রাণ, অগণিত স্বপ্ন আর অসংখ্য রক্তাক্ত স্মৃতির পর ইতিহাস যেন ধীরে ধীরে সেই এক শব্দের পথে এসে থামছে—
শান্তি।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমালোচক।