বাংলাদেশের মানুষ একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জন করেছে—একটি পতাকা, একটি মানচিত্র এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই স্বাধীনতার চেতনায় মানুষ হিসেবে স্বাধীন হতে পেরেছি?
রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও আমাদের সমাজের একটি গভীর মানসিক দাসত্ব যেন শেষ হয়নি। একসময় মানুষ শাসকের অনুগ্রহ, জমিদারের কৃপা কিংবা ক্ষমতাবানের আশ্রয়ের ওপর নির্ভর করত। আজ সেই সংস্কৃতি আধুনিক পোশাক পরেছে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত চরিত্র অনেক ক্ষেত্রে একই রয়ে গেছে। রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার পরিবর্তে আমরা অনেক সময় ক্ষমতাবান ব্যক্তির অনুসারী, অনুগত কিংবা সুবিধাভোগী হতে চাই।
এই মানসিকতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রকাশ হলো ব্যক্তি ও বংশকেন্দ্রিক রাজনীতি। জনগণের একটি অংশ যেন নিজের স্বাধীন বিচারবুদ্ধি দিয়ে নেতা নির্বাচন না করে; বরং কোনো পরিবার, বংশ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতি আনুগত্যকে নিজের রাজনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি মনে করে। ফলে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে নীতির প্রতিযোগিতা থেকে ব্যক্তিপূজা ও বংশপূজার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়।
আমরা অনেক সময় নেতাকে তার প্রজ্ঞা, সততা, ন্যায়বোধ, যোগ্যতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতার জন্য মূল্যায়ন করি না। বরং দেখি—তিনি আমাকে কী দিতে পারেন, আমার অবস্থান কতটা নিরাপদ করতে পারেন, আমার ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ কতটা রক্ষা করতে পারেন। ফলে চাটুকারিতা রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী উপাদানে পরিণত হয়।
অন্যদিকে, দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবির যেন দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, তাদের রাজনৈতিক পদ্ধতিতে অনেক অস্বস্তিকর মিল রয়েছে—ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলীয় আনুগত্যকে যোগ্যতার ওপরে স্থান দেওয়া, দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি, আইনের নির্বাচিত প্রয়োগ, প্রতিপক্ষকে হয়রানি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা।
অর্থাৎ, দুই পক্ষের পতাকা আলাদা হতে পারে, স্লোগান আলাদা হতে পারে; কিন্তু দাসত্বের মানসিক কাঠামো অনেক সময় একই থাকে।
এক পক্ষ অন্য পক্ষের অত্যাচারের অভিযোগ করে, অন্য পক্ষ পাল্টা একই অভিযোগ করে। কিন্তু জনগণের প্রকৃত মুক্তি কোথায়? যদি ক্ষমতাসীনদের অন্যায়কে শুধু তখনই অন্যায় বলা হয় যখন নিজের দল ক্ষমতার বাইরে থাকে, আর নিজের দলের অন্যায়কে ন্যায্যতা দেওয়া হয় যখন তারা ক্ষমতায় থাকে—তাহলে সেখানে ন্যায়বিচার নয়, আছে কেবল দলীয় আনুগত্য।
সত্যিকারের স্বাধীন মানুষ কোনো নেতা, দল বা বংশের দাস নয়। সে সত্যের কাছে দায়বদ্ধ, ন্যায়ের কাছে দায়বদ্ধ, নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ এবং সর্বোপরি স্রষ্টার কাছে দায়বদ্ধ।
আধ্যাত্মিক জাগরণ ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতাও অসম্পূর্ণ। মানুষ যখন নিজের লোভ, ভয়, চাটুকারিতা, স্বার্থপরতা ও অন্ধ আনুগত্য থেকে মুক্ত হতে পারে না, তখন একটি পতাকা পরিবর্তন করলেই তার অন্তর্গত দাসত্বের অবসান ঘটে না।
স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো—আমি অন্যায় করব না এবং অন্যায়কারীকে আমার স্বার্থের জন্য সমর্থনও করব না। আমি ক্ষমতাবানকে সত্য কথা বলতে পারব। আমি নিজের দলের ভুলের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারব। আমি প্রতিপক্ষের ন্যায্য কথাকে স্বীকার করতে পারব। আমি সুবিধার বিনিময়ে নিজের বিবেক বিক্রি করব না।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই শুধু নতুন নেতা, নতুন দল কিংবা নতুন নির্বাচনের ওপর নির্ভর করে না। আমাদের প্রয়োজন নতুন নাগরিক চরিত্র—যেখানে পরিবার থেকে সততা শেখানো হবে, বিদ্যালয়ে নৈতিকতা চর্চা হবে, সমাজে দায়িত্ববোধকে সম্মান করা হবে এবং রাষ্ট্রে আইনের শাসন দল-মত নির্বিশেষে প্রতিষ্ঠিত হবে।
আমাদের স্বাধীনতা যদি কেবল ভূখণ্ডের স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা অসম্পূর্ণ স্বাধীনতা। প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই আসবে, যখন বাংলাদেশের মানুষ ভয় থেকে মুক্ত হবে, চাটুকারিতা থেকে মুক্ত হবে, বংশপূজা থেকে মুক্ত হবে, দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হবে এবং নিজের বিবেক ও ন্যায়বোধের কাছে স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে পারবে।
সেদিন আমাদের স্বাধীনতা স্থানীয় সীমানা অতিক্রম করে মানবিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতায় রূপ নেবে।
কারণ একটি জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু সবসময় বাইরের শাসক নয়; কখনো কখনো তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে ওঠে নিজের ভেতরের দাসত্বের মানসিকতা।
আর সেই দাসত্ব ভাঙার সংগ্রামই হতে পারে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দ্বিতীয় ও আরও গভীর অধ্যায়।
লেখক: ড. মান্নান মৃধা, শিক্ষক