সরকার বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না। রাষ্ট্র বদলাতে হলে বদলাতে হয় ক্ষমতার সংস্কৃতি, প্রশাসনের মানসিকতা এবং জবাবদিহির কাঠামো।
রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফরকে ঘিরে একটি ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা ক্ষমতার দাপট, ব্যক্তিত্বের সীমারেখা এবং পেশাদারত্বের অভাব।
প্রকাশিত বর্ণনা অনুযায়ী, রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে এগিয়ে গেলে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং তাঁকে দূরে ঠেলে দেন। ঘটনাটির দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া নিয়ে নানা আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আরও গভীর।
প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরার মুহূর্তে একটি ছবি তৈরি হতে পারত, আর সেই ছবির রাজনৈতিক ব্যবহারও হতে পারত বহুমাত্রিক। সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এমন একটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তকে কেউ ব্যক্তিগত সখ্য, কেউ বিশেষ আনুকূল্য, আবার কেউ ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারত। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে পেশাদারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচার যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ঘটনাটি সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রশ্ন হলো, একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে একজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের মৌলিক প্রটোকল ও ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয়টি উপেক্ষা করেন?
বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির দিকে তাকালে এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়।
দীর্ঘদিনের অনির্বাচিত ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় প্রশাসনের একটি অংশ রাজনৈতিক ক্ষমতার অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে। জনপ্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং পেশাদারত্ব নিয়ে তখন থেকেই বিতর্ক রয়েছে। ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট রাখা, রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার প্রবণতা প্রশাসনের স্বাভাবিক দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে থাকলে তার প্রভাব এক দিনে দূর হওয়ার কথা নয়।
শেখ হাসিনার শাসনামলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের সম্পর্ক নিয়ে যেসব ঘটনা আলোচনায় এসেছে, সেগুলোর মধ্যে পুলিশপ্রধানকে বাসায় আপ্যায়নের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। তবে ব্যক্তিগত সৌজন্য আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এক বিষয় নয়। সমস্যা তখনই, যখন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার পেশাগত পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বড় হয়ে ওঠে এবং প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ইচ্ছার অধীন হয়ে পড়ে।
এখানেই বর্তমান ঘটনার তাৎপর্য।
একজন প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশবেন, উৎসবে আনন্দ ভাগাভাগি করবেন, পুলিশ সদস্য কিংবা কর্মচারীদের সঙ্গে কোলাকুলি করবেন এটি তাঁর মানবিক আচরণ ও জনসম্পৃক্ততার প্রকাশ হতে পারে। কিন্তু সেই একই প্রধানমন্ত্রী যখন সরকারি সফরে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত পরিসর, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং প্রটোকলও সমানভাবে সম্মান পাওয়ার দাবি রাখে।
সাধারণ মানুষের প্রতি আন্তরিকতা আর সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পেশাগত দূরত্ব দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য হলো, কোথায় মানবিক হতে হবে এবং কোথায় প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে, তা বুঝতে পারা।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: একজন কর্মকর্তার তাৎক্ষণিক আচরণ বা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া দিয়ে পুরো প্রশাসনের চরিত্র বিচার করা যায় না। একইভাবে, কাউকে সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যমান ঘটনাই প্রশাসনিক সংস্কারের প্রমাণ নয়। সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা হবে নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
জড়িয়ে ধরতে এগিয়ে যাওয়া কর্মকর্তার পরিচয় হিসেবে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনারের নাম আলোচনায় এসেছে। তাঁর পূর্ববর্তী কর্মস্থল ময়মনসিংহে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে ওএসডি করা হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবে ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট, সরকারি ব্যাখ্যা এবং ওএসডির সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই ঘটনার কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ, ওএসডি হওয়া মানেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
আমাদের প্রত্যাশা কোনো কর্মকর্তাকে অপমান করা নয়; বরং এমন একটি প্রশাসন গড়ে তোলা, যেখানে কেউ ক্ষমতার দাপট দেখাতে পারবেন না, রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার পাবেন না এবং জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবেন না।
আমলাতন্ত্রকে বদলাতে হলে শুধু ব্যক্তির আচরণ সংশোধন করলেই চলবে না। প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি, স্বচ্ছ পদায়ন ও পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নাগরিকের প্রতি দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা। নির্বাচিত সরকারকে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করতে হবে।
আমলাতন্ত্রকে ধাক্কা দিতে হবে তবে সেই ধাক্কা যেন ব্যক্তিগত অপমানের নয়, হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে; ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে; চাটুকারিতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এবং জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি প্রশাসন চায়, যেখানে কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য নয়, সংবিধান ও আইন মেনে জনগণের সেবা করার জন্য দায়িত্ব পালন করবেন। যেখানে ক্ষমতাবানদের সামনে নতজানু হওয়া যেমন পেশাদারত্ব নয়, তেমনি সাধারণ নাগরিকের প্রতি ঔদ্ধত্যও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াকে কেউ ইতিবাচকভাবে দেখতে পারেন। কিন্তু আমাদের আসল প্রত্যাশা, এই ঘটনা যেন কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং প্রশাসনিক সংস্কারের একটি বৃহত্তর বার্তা হয়ে ওঠে।
কারণ, সরকার বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না। রাষ্ট্র বদলাতে হলে বদলাতে হয় ক্ষমতার সংস্কৃতি, প্রশাসনের মানসিকতা এবং জবাবদিহির কাঠামো।
আমলাতন্ত্রকে সেই পরিবর্তনের মুখোমুখি করতেই হবে।
টিটো রহমান
গণমাধ্যম কর্মী।