২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন পরবর্তী সময়কাল বাংলাদেশের গণমাধ্যম ইতিহাসের এক সংকটময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর সমাজ যখন একটি নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে ধাবিত হতে চায়, তখন তথ্যের প্রধান বাহক হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল পথপ্রদর্শকের। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র। রাজনৈতিক দল, নবগঠিত অ্যাক্টিভিস্ট গোষ্ঠী ও সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ গণমাধ্যমকে কেবল তাদের ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তুই বানাচ্ছে না, বরং প্রায় প্রতিটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের জন্য সংবাদ সংস্থাসমূহকে সরাসরি দায়ী করার একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলছে। এই প্রবণতাটি কেবল সাধারণ সমালোচনা নয় বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্কেপগোটিং’ বা বলির পাঠা বানানো বলা হয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে গণমাধ্যমের একাংশের অতি আনুগত্য ও সাংবাদিকতার নৈতিক বিচ্যুতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বর্তমানে অতি সামান্য ইস্যুতেও গণমাধ্যমকে যেভাবে সামাজিক বিচার বা ‘সোশ্যাল জাস্টিস’-এর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে, তা বাংলাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্বের এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
শেখ হাসিনার আমলের বাংলাদেশে গণমাধ্যমের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও করপোরেট স্বার্থের এক অস্বাস্থ্যকর সংমিশ্রণ সংবাদ জগতের স্বাধীনতাকে প্রায় ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। আওয়ামী আমলের গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেখানে প্রধান গণমাধ্যমগুলোর মালিক ছিলেন সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীসমূহ । এই মালিকেরা তাদের ব্যবসায়িক সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক সুবিধা লাভের আশায় গণমাধ্যমকে কেবল তথ্যের বাহক হিসেবে নয় বরং সরকারি প্রোপাগান্ডা বা প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। এই সময়কালকে সাংবাদিকতার ইতিহাসে ‘সিলিকন সেন্সরশিপ’ এবং প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্যের চরম পর্যায় হিসেবে দেখা হয়।
‘জুলাই বিপ্লব’-এর সময় মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর বিতর্কিত ভূমিকা গণমাধ্যমে আওয়ামী নিয়ন্ত্রণের একটা বড় উদাহরণ। যখন রাজধানী ঢাকার রাস্তায় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশের গুলিতে শত শত শিক্ষার্থী নিহত হচ্ছিলেন, তখন অনেক টেলিভিশন চ্যানেল এবং সংবাদপত্র সেই হতাহতের সঠিক সংখ্যা প্রচার না করে বরং রাষ্ট্রীয় বয়ান বা স্টেট ন্যারেটিভ প্রচারেই বেশি ব্যস্ত ছিল । আন্দোলনের সময় আবু সাঈদের মতো বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের ভিডিও যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোটি মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করছিল, তখন অনেক জাতীয় সংবাদমাধ্যম সেই সত্য প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিল। অনেক সাংবাদিক পরে তাদের অভিজ্ঞতায় বর্ণনা করেছেন যে,কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরাসরি নির্দেশের মাধ্যমে খবরের বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং ‘লয়্যাল নিউজম্যান’ বা অনুগত সাংবাদিকদের মাধ্যমে সংবাদকক্ষে নজরদারি চালানো হতো ।
এই দীর্ঘস্থায়ী নৈতিক অবক্ষয় ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যমের ওপর জনরোষের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষ যখন দেখল যে তথ্যের প্রধান রক্ষকগণই ফ্যাসিবাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন, তখন তাদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, গণমাধ্যম কেবল তথ্যের বিকৃতিই ঘটায় না বরং এটি শোষণের একটি হাতিয়ার। ফলে ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যম যখন নতুন রূপে ফেরার চেষ্টা করছে, তখন রাজনৈতিক দল ও অ্যাক্টিভিস্টরা বারবার অতীতের এই ত্রুটিপূর্ণ সাংবাদিকতার উদাহরণ টেনে এনে বর্তমানের যেকোনো সমালোচনাকে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে গণমাধ্যমকে সব বিষয়ের জন্য দায়ী করার পেছনে কাজ করছে একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যা স্কেপগোটিং থিওরি বা বলির পাঠা বানানোর তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যখন কোনো সমাজ চরম অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা এবং রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়, তখন সেই সমাজের মানুষ তাদের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত ব্যর্থতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে একটি সহজ ও দৃশ্যমান লক্ষ্যবস্তু খোঁজে । বাংলাদেশে বর্তমানে এই লক্ষ্যবস্তু হলো গণমাধ্যম।
মনস্তত্ত্ববিদ গর্ডন অলপোর্টের মতে, স্কেপগোটিং হলো এক ধরণের ‘ডিফেন্সিভ প্রজেকশন’ বা আত্মরক্ষামূলক, যেখানে ব্যক্তি তার নিজের অপরাধবোধ বা হীনমন্যতা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে শান্তি পায় । বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যারা দীর্ঘ ১৫ বছর রাজপথে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা এখন গণমাধ্যমকে দায়ী করছে এই বলে যে, গণমাধ্যম যদি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলত তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। এটি মূলত তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যর্থতার গ্লানি মোচনেরও একটি উপায়। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটি ‘ভ্যালু থ্রেট’ বা নৈতিক হুমকির সাথে জড়িত । যখন কোনো দল বা গোষ্ঠী অনুভব করে যে তারা তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করেনি, তখন তারা গণমাধ্যমকে ‘শয়তানি সত্ত্বা’ হিসেবে উপস্থাপন করে নিজেদেরকে নৈতিকভাবে শুদ্ধ ঘোষণা করে।
আবার বিপ্লব পরবর্তী সময়ে মানুষের প্রত্যাশা থাকে আকাশচুম্বী, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন আসতে সময় লাগে। এই সময় যে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের ‘কন্ট্রোল থ্রেট’ বা নিয়ন্ত্রণের অভাবজনিত আতঙ্ক সৃষ্টি করে। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যখন মানুষ অনুভব করে যে পরিস্থিতি তাদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন তারা একটি সুনির্দিষ্ট ‘শত্রু’ চিহ্নিত করতে চায় যাকে দায়ী করলে তাদের মনে হয় যে তারা সমস্যার কারণটি বুঝতে পেরেছে । গণমাধ্যম যেহেতু প্রতিদিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করে, তাই যেকোনো অসংগতির জন্য গণমাধ্যমকে দায়ী করা সহজ। অ্যাক্টিভিস্টরা মনে করেন যে, গণমাধ্যম যেহেতু এখনও পুরাতন কাঠামোর অংশ, তাই তারাই সরকারের সংস্কার কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে বা নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে জনমনে বিভক্তি সৃষ্টি করছে ।
এদিকে গণমাধ্যমকে কেবল বড় রাজনৈতিক ভুল নয় বরং অত্যন্ত ক্ষুদ্র বিষয়েও চরম আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই আক্রমণের ধরণটি অনেকটা ডিজিটাল মবিংয়ের মতো। এই পরিস্থিতির পেছনে কাজ করছে সোশ্যাল জাস্টিস বা সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা, যা অনেক ক্ষেত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিপরীতে এক ধরণের উগ্র প্রতিক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সময় দেখা যায় যে, কোনো সংবাদের শিরোনামে ব্যবহৃত একটি শব্দ বা কোনো টকশোতে আমন্ত্রিত কোনো অতিথির পূর্বতন পরিচয় নিয়ে বিশাল হাঙ্গামা সৃষ্টি হচ্ছে। অ্যাক্টিভিস্টদের যুক্তি হলো, ফ্যাসিবাদের দোসরদের কোনোভাবেই গণমাধ্যমে জায়গা দেওয়া যাবে না। কিন্তু এই ‘দোসর’ চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি অনেক সময় অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ। লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ৫ আগস্টের পর সংবাদমাধ্যমের জন্য একটি নতুন ধরণের অলিখিত কোড অফ কন্ডাক্ট তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে । যদি কোনো গণমাধ্যম বর্তমান প্রশাসনের কোনো ভুল ত্রুটি নিয়ে খবর প্রকাশ করে, তবে তাকে তৎক্ষণাৎ ‘ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপের ফলে অনেক সাংবাদিক সেলফ সেন্সরশিপের আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন ।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’ পরবর্তী সময়ের সাথে তুলনা করা যায়। আরব বসন্তের সময় তিউনিসিয়া এবং মিশরেও দেখা গিয়েছিল যে, বিপ্লবের পর মানুষ গণমাধ্যমকে তাদের প্রথম শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল কারণ তারা এতদিন স্বৈরাচারের ‘গুণগান’ গেয়েছিল ।
তিউনিসিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, বিপ্লব পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম সংস্কারের জন্য তারা অনেকগুলো কমিশন গঠন করেছিল, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুকরণের কারণে গণমাধ্যম শেষ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। মিশরের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। সেখানে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে আবার নতুন ধরণের কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা। গণমাধ্যমকে যদি কেবল ‘শত্রু’ হিসেবে দেখা হয় এবং তাকে সংস্কারের সুযোগ না দিয়ে ধ্বংস করা হয়, তবে তার ফলাফল হিসেবে সমাজে তথ্যের শূন্যতা তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত গুজব এবং অস্থিরতাকেই বাড়িয়ে দেবে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটর