বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে যে শহর, সে শহর এখন ‘পুরান ঢাকা’ নামেই পরিচিত। কালক্রমে বুড়িগঙ্গার পানি দূষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শহরের নামের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে ‘পুরান’ শব্দটি। অথচ এখান থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছিল আধুনিক ঢাকার। বয়সের ভারে এখন নতজানু এই পুরান ঢাকা। ঢাকার এই অংশের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। পুরান ঢাকা সম্পর্কে কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় এর সীমানা সম্পর্কে। সূত্রাপুর, বংশাল এবং লালবাগের অন্তর্গত এলাকাকেই পুরান ঢাকা বলে গন্য করা হয়।
বাংলাদেশে যতগুলো আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে, তার মধ্যে ‘ঢাকাইয়া ভাষা’ অন্যতম। এই ভাষা শুধু আলোচিতই নয়, বরং জনপ্রিয়ও বটে। যখন ঢাকার বাইরে যাই, তখন সেখানকার মানুষ আমার কাছে প্রথম যে বায়না ধরেন তা হলো, ‘ভাই, একটু ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলেন’। তাদের আবদার রাখি, ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলি, তারা পরম আনন্দ লাভ করে।
ঢাকাইয়ারা বাইরের মানুষের সঙ্গে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করে। আর যখন তারা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করে, তখন সেটা হয়ে ওঠে আরেক মজার উপস্থাপন। বাক্যের কোথাও না কোথাও অন্তত একটি ঢাকাইয়া ভাষার শব্দ ঢুকে যাবেই। আর সেটাই হয়ে ওঠে হাসির খোরাক। যেমন ধরুন, ঢাকার বাইরের কেউ একজন ঢাকাইয়াকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাই, এই বাড়িটা কোন দিকে?’ তখন ঢাকাইয়া উত্তর দিচ্ছে, ‘ছোজা যাবেন। তারপর ডানের গলিতে ঢুকে বামে মোড় নিবেন। পেয়ে যাবেন। যেভাবে বললাম সেভাবে যাবেন। আউরা-তাউরা ঘুইরেন না।’ এই যে ‘আউরা তাউরা’-এর অর্থ ‘উল্টাপাল্টা’ বা ‘এলোমেলো’। গত দশ-পনের বছর আগ পর্যন্ত পুরান ঢাকার প্রায় সব বয়সী মানুষই ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলতো। এখন অবশ্য চিত্র বদলেছে। শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভাষায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। জেনজিরা ঠিকভাবে পুরান ঢাকার ভাষায় কথা বলতে পারে না। এরা ঢাকাইয়া এবং প্রমিত বাংলার মাঝামাঝি কিছু একটা বলে।
বাসায় বয়স্কদের সঙ্গে তারা টুকটাক ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বললেও এলাকার বাইরে তাদের ভাষা ভিন্ন। তারা প্রমিত বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করে। তাই পুরান ঢাকার সীমানার বাইরে উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের বোঝাই দুষ্কর হয় উঠছে যে, তারা ঢাকাইয়া। যে কারণে পুরান ঢাকার ভাষা দিন দিন বিলুপ্তির দিকেই এগোচ্ছে বলা যায়।
পুরান ঢাকার এই ভাষা বিলুপ্তির আশংকা অবশ্য কিছু এলাকার জন্য প্রযোজ্য নয়। কারন এরা ঢাকাইয়া ভাষায় কথা না বলে উর্দু এবং হিন্দির মিশেলে আজব এক প্রকারের ভাষায় কথা বলে। একটি বাক্য এখানে তুলে দিলে আপনাদের বুঝতে সুবিধা হবে। এরা যেমন বলে, ‘হামোকা বাড়ি মে তুমোকা দাওয়াত’। এর অর্থ হলো ‘আমার বাড়িতে তোমার নিমন্ত্রন’। আগামাসি লেন, হোসনে দালান হয়ে লালবাগ পর্যন্ত এই ভাষাভাষী মানুষের সাক্ষাত মেলে। ওসব এলাকার মানুষ এখনো নিজেদের আবিষ্কৃত এই ভাষাতেই কথা বলে। শিক্ষার প্রসার, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন মোকাবেলায় এরা সফল। তারা তাদের নিজেদের ভাষার মাঝেই আত্মার সুখ খুঁজতে চান সব সময়।
ঢাকাইয়া ভাষার জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখেই এই ভাষায় নির্মিত হয়েছে বহু নাটক, এখনো হচ্ছে, হতেই থাকবে হয়তো। এসব নাটক ঢাকার বাইরের মানুষ বেশ আনন্দ নিয়ে উপভোগ করলেও এর বিরুদ্ধে ঢাকাইয়াদের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তাদের প্রধান অভিযোগ নাটকের বাচিক বা উচ্চারণ এবং পোশাক নিয়ে। সব সময়ই পুরান ঢাকার মানুষের পোশাকে রয়েছে নিজস্বতার ছোঁয়া। এখানকার উঠতি বয়স্করা রঙিন পোষাক পরতে ভালবাসেন, আর বয়স্করা প্রধান্য দেন সাদা রঙের পোশাক। পোশাকের ডিজাইন এবং কাটিংয়েও রয়েছে ভিন্নতা। নাটকে এসবের কিছুই তুলে ধরা হয় না। আর উচ্চারনের কথা তো বলাই বাহুল্য। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যেভাবে চিবিয়ে ঢাকাইয়া ভাষা বলেন, তাতে ভাষার রস উধাও হয়ে যায়। আদতে ঢাকাইয়া ভাষা বেশ রসসমৃদ্ধ।
পুরান ঢাকার সংস্কৃতিও বেশ সমৃদ্ধ। এ অঞ্চলে ধর্মীয় সম্প্রীতি উল্লেখ করার মতো। এখানে শাখারী বাজার, তাঁতী বাজার সূত্রাপুরসহ অনেক যায়গায় রয়েছে বেশ বড় বড় হিন্দু পাড়া। লক্ষীবাজারসহ তার আশেপাশে রয়েছে খ্রিষ্টান ধর্মের মানুষ। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে তো মুসলিমরা রয়েছেই। কিন্তু এখানে দাঙ্গার মতো ঘটনা তো ঘটে না। শবেবরাত, শবেমেরাজ, লাইলাতুল কদর, দূর্গা পুজা, বড়দিনসহ সকল ধর্মের সকল উৎসব পালিত হয় ধুমধাম করেই। মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান আমলের শেষ দিক পর্যন্ত সকল মুসুলম রীতি-রেওয়াজ মানা হতো। বর এসে মসজিদে বসতো। কাজী সাহেব কনের এজিন বা সম্মতি নিয়ে মসজিদে এসে বরের সম্মতি জানতেন। তারপর বিয়ে পড়ানো হতো। বিয়ের পড়ানোর পর খেজুর বিতরন করা হতো। বিয়ে বাড়ির দরজায় একজন দাঁড়িয়ে থাকতেন। তার কাজ ছিলো বিয়ের নিমন্ত্রনে আগত অতিথিদের রিকশা ভাড়া পরিশোধ করা। ছোট ছেলে-মেয়েরা অথিথিদের পান, শরবত খাইয়ে বকশিস কুড়াত। কমিউনিটি সেন্টারের প্রচলের পর এসব রেওয়াজ এখন আর দেখা যায় না।
পৌষ সংক্রান্তি বা শাকরাইনেরও ছিল এক অনন্য রূপ। এদিন কনের বাড়ি থেকে মাঞ্জা দেওয়া সুতোসহ নাটাই আর ঘুড়ি পাঠানো হতো বরের বাড়িতে। তার সঙ্গে পাতিল ভর্তি শীতের পিঠা। বর তার বন্ধুদের নিয়ে পিঠা খেতো আর ঘুড়ি উড়াত। দুঃখের বিষয় হলো, মরতে বসেছে এই শাকরাইনও। শাকরাইন এখন পালিত হচ্ছে থার্টি ফাস্টের আদলে। এটা আমাদের উৎসব নয়। সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার ভাষা এবং সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখন এর চর্চার কোন বিকল্প নেই। যেভাবেই হোক আগামী প্রজন্মতে জানাতে হবে তার নিজস্ব ঐতিহ্য সম্পর্কে। নাহলে আমরা দিন দিন পরিচয়হীন হয়ে পড়ব। পুরান ঢাকার প্রতি এক রাশ ভালোবাসা। নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিতে দুধে-ভাতে থাকুক এ শহর!
লেখক: ছড়াকার, সাংবাদিক