আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা। বিশেষ করে সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া অধ্যাদেশগুলো এবং রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা কী হয় সেটি দেখতে দেশবাসীর চোখ এখন জাতীয় সংসদের দিকে!
বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্য সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে তারা সংসদের ভেতরে এবং বাইরে আন্দোলনের পথে যাবেন। সংসদে না হলে রাজপথেই হবে ফয়সালা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা ২১২টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ৭৭টি আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি আসন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে বিজয়ী হয়েছেন। ভোট নিয়ে জামায়াত জোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলেছে। তারপরও তারা এ নিয়ে বৃহত্তর কোনো কর্মসূচিতে যায়নি।
বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন ছিল। অনেকের মতে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সংসদে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা ছিল গৌণ। ফলে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদের ভেতরে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ দেখা যায়নি। সমালোচকদের মতে, সেই সময় সরকার তুলনামূলক কম বাধার মুখে তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত সংসদে পাস করাতে সক্ষম হয়েছিল।
এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ বিরোধী দল হিসেবে সংসদে এসেছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের জোটসঙ্গীরা। ফলে সংসদে সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে আরও তর্ক-বিতর্ক এবং আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ড. মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটসঙ্গীদের বাইরে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সেই সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের কথা সামনে আসে। তবে প্রায় ১৮ মাস সময় পার হলেও রাজনৈতিক সমঝোতা ও সাংবিধানিক জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। এই ব্যর্থতা অন্তবর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও স্বীকার করা হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করে। এসব অধ্যাদেশের অনেকগুলো এখন সংসদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। নতুন সংসদে এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হতে হবে।
ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কার্যনির্বাহী পরিষদের অন্যতম সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, জুলাই সনদে দেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে। তাই এটি বাস্তবায়ন করা সবার নৈতিক দায়িত্ব।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন কোনো একক দলের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন। আন্দোলনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয় এবং সংস্কারের জন্য ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। সেখানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন বড় ও ছোট রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে নিজেদের মতামত তুলে ধরে। কেউ কেউ নোট অব ডিসেন্টও জমা দেয়। সবশেষে সবাই মিলে জুলাই চার্টারে স্বাক্ষর করে।
মিলন আরও বলেন, যেসব বিষয়ে সবাই স্বাক্ষর করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের নৈতিক দায়িত্বও সবার ওপর বর্তায়। সংসদে সরকারের ভালো উদ্যোগগুলোতে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি। তবে জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত এলে সংসদের ভেতরেই তার বিরোধিতা করা হবে এবং বিষয়টি জাতির সামনে তুলে ধরা হবে।
১১ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা এবং রংপুর-৪ (পীরগাছা–কাউনিয়া) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এসব অধ্যাদেশ সংসদে পাস না হলে বিভিন্ন খাতে সংকট তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, প্রতিটি অধ্যাদেশের আলাদা প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে মাদক ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ আইনে রূপ না পেলে মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫–এর ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, একই শপথ অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্যরা সেই শপথ গ্রহণ করেননি। এটি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ লঙ্ঘনের শামিল।
আখতার হোসেন বলেন, গণভোটের সময় দেশের জনগণ স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ভোট দিয়েছে। জনগণের সেই মতামতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যদি কেউ গণভোটের রায়কে পাশ কাটানোর চেষ্টা করে, তাহলে জনগণ তা মেনে নেবে না।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. আতিক মুজাহিদ বলেন, বিরোধী দল হিসেবে জনগণের অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সংসদে জোরালোভাবে তুলে ধরবে এনসিপি।
তিনি বলেন, একটি বিরোধী দল যে ভূমিকা পালন করে, ঠিক সেই ধরনেরই তাদের ভূমিকা থাকবে। মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য যেসব বিষয় প্রয়োজন, সেগুলো সংসদে উত্থাপন করা হবে। কারও অনুগ্রহে নয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছি আমরা।
তিনি আরও বলেন, সংসদের প্রথম ভাষণ থেকেই সরকারের অবস্থান অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে ইতোমধ্যে কিছু বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, কেউ কেউ জুলাইয়ের বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
জুলাই সনদের প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে ডা. আতিক মুজাহিদ বলেন, সংসদের ভেতরে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে। প্রয়োজনে রাজনৈতিকভাবে মাঠে কর্মসূচি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যেসব বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন হবে, সেগুলো আদালতের মাধ্যমেও এগিয়ে নেওয়া হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং জুলাই আন্দোলনের স্পিরিট বজায় রাখার জন্য বিরোধী দল হিসেবে আমরা সংসদের ভেতরে এবং বাইরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত আছি।