বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল—বিএনপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পেরিয়ে এসেও সংগঠনটি এখন এক অদ্ভুত সাংগঠনিক স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় দুই বছর হতে চললেও কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ রূপ না পাওয়ায় তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। অভিযোগ উঠছে, আংশিক কমিটির দীর্ঘ আবছায়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে সংগঠনের স্বাভাবিক গতিশীলতা।
দীর্ঘদিন ধরে রাজপথের সোচ্চার কণ্ঠধারী এই সংগঠনে এখন দিবস-ভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে নতুন কোনো উদ্ভাবনী উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব এবং কাঠামোগত অসম্পূর্ণতার কারণে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে যারা বিগত এক দশকের কঠিন সময়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তাদের যোগ্য মূল্যায়ন ও পদায়ন না হওয়ায় এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় কেবল রাজপথের আন্দোলন নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা জরুরি। কিন্তু বর্তমান যুবদলের কর্মসূচিতে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতা বা তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের মতো যুগোপযোগী ভাবনার অভাব প্রকট।
যুবদলের সাংগঠনিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর অন্তর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়েছে খুব কম। ১৯৭৮ সালের ২৭ অক্টোবর প্রতিষ্ঠার পর নিয়মিত কাউন্সিল হলে বর্তমানে ১৬তম কমিটি দায়িত্ব পালনের কথা ছিল, কিন্তু বর্তমানে চলছে মাত্র অষ্টম কমিটির নেতৃত্ব।
সংগঠনটির অধিকাংশ কমিটিই গঠিত হয়েছে আংশিক আকারে এবং মেয়াদের একদম শেষ পর্যায়ে এসে সেগুলো পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকের মির্জা আব্বাস-গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কমিটি থেকে শুরু করে ২০০২ সালের বরকত উল্লাহ বুলু-মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কমিটি—সবগুলোতেই পূর্ণাঙ্গ কমিটির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০১০ পরবর্তী প্রতিটি কমিটিই (নীরব-টুকু, টুকু-মুন্না) একই বৃত্তে বন্দি ছিল।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৯ জুলাই আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে ছয় সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে কমিটি ঘোষণার প্রায় ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও তা পূর্ণাঙ্গ করার কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ নেই।
অবশ্য কেন্দ্রীয় কমিটি অসম্পূর্ণ থাকলেও জেলা ও মহানগর পর্যায়ে কিছু অগ্রগতির দাবি করেছেন সংগঠনের নেতারা। সংগঠনের সহ-দপ্তর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, বর্তমান আংশিক কমিটির অধীনে ইতোমধ্যে ১৪টি নতুন ইউনিট কমিটি গঠন এবং ২৪টি কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ করা হয়েছে। এসব ইউনিটের কার্যক্রম ইতিবাচক সাড়া ফেলছে বলেও তিনি দাবি করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুবদলের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থবিরতা কাটিয়ে সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করা। এর জন্য প্রথম ধাপ হওয়া উচিত দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে দায়িত্ব বণ্টন করা। একই সঙ্গে কেবল অতীতের আন্দোলনের স্মৃতি রোমন্থন না করে ভবিষ্যতের আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির রূপরেখা প্রণয়ন করা।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো বাস্তবমুখী ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি গ্রহণ করলে আধুনিক মনস্ক তরুণরা এই সংগঠনের প্রতি আগ্রহী হবে। কেবল আনুষ্ঠানিকতার বেড়াজাল ভেঙে প্রযুক্তি ও মেধানির্ভর রাজনৈতিক উদ্যোগই পারে যুবদলকে তার হারানো জৌলুস ফিরিয়ে দিতে।
যুবদলের এই সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানালেন কয়েকজন নেতা। সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল জানান, সম্প্রতি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডায়াস্পোরা ইউনিটে কমিটি সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ইতোপূর্বে দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পূর্ণাঙ্গ কমিটির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বর্তমানে যেকোনো মুহূর্তে কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হতে পারে।
দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম, হামলা-মামলা ও প্রশাসনিক চাপের মুখে সক্রিয় থাকলেও অনেক ত্যাগী নেতা এখন পরিচয়হীনতায় ভুগছেন। ঢাকা মহানগর, জেলা ও সাভার অঞ্চলের পদপ্রত্যাশী নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রায় ছয় মাস আগে যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা জমা দেওয়া হলেও কোনো অগ্রগতি নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা এখনো আদালতের বারান্দায় হাজিরা দিচ্ছি, অথচ আন্দোলনের সময় পাশে দেখা যায়নি, এমন সুবিধাবাদীরা এখন এমপিদের পাশে জায়গা করে নিয়ে ফায়দা লুটছে।’ অনেক উচ্চশিক্ষিত নেতা দীর্ঘ সংগ্রামের কারণে ক্যারিয়ার গড়তে না পেরে এখন চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।
এই বঞ্চনার বিষয়ে কামরুজ্জামান জুয়েল বলেন, ‘আংশিক কমিটি হওয়ার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে সব ইউনিটে কমিটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ কমিটি হচ্ছে, যেখানে অনেকেরই পদায়ন হবে। পদের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় হয়তো সবাইকে পদ দেওয়া সম্ভব হবে না, তবে রাজপথের অবদানের জন্য দলীয় পরিচয়ে সবার ত্যাগের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হবে।’
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুবদলের কার্যক্রমে নতুন প্রজন্মের সম্পৃক্ততা ও উদ্ভাবনী চিন্তার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। ছাত্রদলের এক কেন্দ্রীয় নেতা মনে করেন, ছাত্রদলের পরবর্তী ধাপ যুবদল হলেও বর্তমানে এমন কোনো আকর্ষণীয় কর্মসূচি নেই যা দেখে তরুণ সমাজ আগ্রহী হবে। তার মতে, এখন দল ক্ষমতায় থাকায় অত্যন্ত সুচিন্তিত ও ভবিষ্যৎমুখী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) সহকারী অধ্যাপক কবিরুল হাসান বলেন, ‘যুবদলের কর্মকাণ্ড এখন মূলত বিশেষ দিবস পালন ও প্রটোকল-নির্ভর উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তরুণদের মধ্যে যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন যুবদলের কাজে অনুপস্থিত। তারেক রহমানের বক্তব্যে আধুনিক মনস্তত্ত্বের ইঙ্গিত থাকলেও সংগঠনটি তা ধারণ করতে পারছে না।’
তবে এই অভিযোগের বিপরীতে কামরুজ্জামান জুয়েল বলেন, ছাত্রদলের নিষ্ক্রিয়তার কারণে তারা ‘শিশু উৎসব’-এর মতো কাজ করেছেন। এছাড়া ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন’ শীর্ষক সেমিনারগুলো বেশ আলোচিত হয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য এখন সারাদেশের যুবসমাজকে জাতীয়তাবাদী আদর্শে দীক্ষিত করা এবং কর্মসংস্থানে সরকারের সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করা।
সংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হামলা ও মাদকের অভিযোগ ওঠায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্র। সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন যেমনটা বলছেন, “আমরা ‘ডিনায়াল কালচার’ বা অপরাধ আড়াল করার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসেছি। অপরাধী শনাক্ত হলে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে বরং বহিষ্কার ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমি নিজে বাদী হয়েও মামলা করেছি।”
পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের হতাশার কথা স্বীকার করে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, কমিটি জমা দেওয়া আছে এবং যেকোনো সময় সুসংবাদ আসবে। বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন, ‘যুবদলের বলয় ভ্যানচালক থেকে উচ্চশিক্ষিত যুবক পর্যন্ত বিস্তৃত। সবাইকে দিয়ে সব ধরনের কাজ করানো সম্ভব নয়। তবে এই বাস্তবতার মধ্যেই আমরা সাধ্যমতো সেমিনার ও সৃজনশীল প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।’