তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
অবশেষে দীর্ঘ ১৮ বছরের লন্ডনে নির্বাসিত জীবন শেষে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) স্বদেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বইছে উৎসবের আমেজ।
দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে বরণ করে নিতে বিএনপি রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই সাংগঠনিকভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রতিটি সাংগঠনিক কমিটি নেতাকর্মীদের নিয়ে নিয়মিত যৌথসভা করে দলের ভবিষ্যৎ কান্ডারীকে গণসংবর্ধনা দিতে রাজধানীতে হাজির হতে নির্দেশনা দিয়েছে। বিএনপির পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষও তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে উৎসুক ও অধীর অপেক্ষায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ বিমানের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছাবেন তারেক রহমান। তার সঙ্গে থাকবেন তার সহধর্মিণী ডা. জোবায়দা রহমান ও কন্যা জায়মা রহমান। বিমান বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত হয়ে তারেক যাবেন রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কে।
সেখানে নিজ মাতৃভূমিতে ফেরায় তার সম্মানে গণসংবর্ধনা দেবে বিএনপি। গণসংবর্ধনা শেষে তিনি বসুন্ধরায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার মা দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন। ২৩ নভেম্বর থেকে সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে দলীয় সূত্রে জানা যায়, তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যে রাজধানীতে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর সমাবেশ ঘটাতে চায়। বিমানবন্দর থেকে মহাসড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে শৃঙ্খলার সঙ্গে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়ে তিনি সংবর্ধনাস্থল রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় পৌঁছাবেন। সেখানে উপস্থিত জনতার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর জনসমাবেশে বক্তব্য দেবেন তিনি।
তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবতর্নকে ঘিরে বিএনপি গঠিত অভ্যর্থনা কমিটির আহ্বায়ক দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সংবর্ধনা দিতে বিএনপির প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। নেতাকর্মীদের উৎসাহ-আনন্দ এক কথায় অসাধারণ। কত সমাগম হবে তা বলা মুশকিল। তবে বলা যায়, তারেক রহমানকে সংবর্ধনা দিতে যে উপস্থিতি হবে তা এদেশের ইতিহাসে অতীতে কখনও হয়নি।
বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীদেরও দাবি, তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জনসমাবেশ হতে যাচ্ছে। শুধু দলীয় শক্তি প্রদর্শন নয় বরং তারেক রহমানের এই আগমনকে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এক নতুন মোড় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ জনতা।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের বিরতির পর আগামী ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেদিন তারেক রহমানের সংবর্ধনায় মানুষের মহামিলন হবে। আমরা প্রত্যাশা করছি, আমাদের নেতার দেশে আগমনকে কেন্দ্র করে কমপক্ষে অর্ধকোটি মানুষের উপস্থিতির ঘটনা ঘটবে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে ওইদিন কত মানুষ হাজির হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। তবে এটা যে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ সমাবেশ হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন ঘিরে শুধু বিমানবন্দর আর ৩০০ ফিট নয় বরং পুরো রাজধানীতেই মানুষের ঢল নামবে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, কত মানুষ হবে তা অনুমান করা কঠিন। তবে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
তিনি বলেন, তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষ্যে ঢাকায় যে সমাবেশ হবে তা দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই সমাবেশে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আসবে। আসবে মা-বোনেরা।
আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, আশা করি নিরাপত্তায় কোনো সমস্যা হবে না। সরকারের নিরাপত্তার সঙ্গে দলীয় নিরাপত্তাকর্মীরাও কাজ করবেন। এ ছাড়া চেয়ারপারসনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত দলীয় সিএসএফ থাকবে। আশা করি নিরাপত্তায় ব্যাঘাত ঘটবে না।
এদিকে সাধারণ মানুষ বলছে, দীর্ঘদিন পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরা উপলক্ষ্যে তাদের মধ্যেও একটা উত্তেজনা রয়েছে। সবাই এটা নিয়ে আলোচনা করছেন। যারা বিএনপি সমর্থক তারা বলছেন, তারেক রহমান দেশে ফিরলে দেশের অগোছালো রাজনীতির পুরো চিত্রই পাল্টে যাবে। এটা বিএনপির জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। ঘরে অভিভাবক থাকলে যেভাবে ঘর মজবুত থাকে। তারেক রহমান দেশে ফিরলে বিএনপিও মজবুত হবে।
বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ বলেন, সারাদেশের লাখ লাখ বিএনপির নেতাকর্মীর পাশাপাশি দেশের কোটি জনতা অধীর আগ্রহে তারেক রহমানের আগমনের অপেক্ষায় আছে। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। তাকে এক নজর দেখতে ২৫ ডিসেম্বর দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা থেকে দলীয় নেতাকর্মীসহ হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ঢাকায় আসবেন। ফলে লাখ লাখ লোকের সমাগম হবে। আমরা আশাকরি জনগণের ভালোবাসায় আপ্লুত হবেন আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা ও আশেপাশের জেলা টাঙ্গাইল, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ থেকে কয়েক লাখ লোক আসবেন। এ ছাড়া বগুড়াসহ রাজশাহী ও উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর আসার কথা রয়েছে। একইসঙ্গে দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে কয়েক হাজার নেতাকর্মীর আসার সম্ভাবনা আছে।
রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কের ওপর তারেক রহমানের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে সংবর্ধনা মঞ্চ। ইতোমধ্যে সেখানে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। তারা কড়া নজরদারিতে রেখেছেন পুরো এলাকা। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা বাহিনীর লোকেরাও নিরাপত্তার বিষয়টি নজরদারিতে রেখেছেন। মঞ্চ প্রস্তুতির তদারকিতে আছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেতাকর্মীসহ কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতারা।
এদিকে সংবর্ধনায় সারাদেশের নেতাকর্মীদের অংশ গ্রহণের সুবিধার্থে বিশেষ ট্রেন ও ট্রেনে অতিরিক্ত বগি চেয়ে সরকারের রেলপথ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিল বিএনপি। আবেদনে দলটির পক্ষ থেকে জানিয়েছিল-বরাদ্দকরা ট্রেনের সমস্ত ভাড়া দলটি পরিশোধ করবে।
সংবর্ধনায় বিএনপির আবেদনের প্রেক্ষিতে ১০টি রুটে বিশেষ ট্রেন চলাচলের অনুমোদন দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ২৫ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) রাজধানীর কাছাকাছি তিনটি রুটে ট্রেন চলাচল স্থগিত থাকবে বলেও জানিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঢাকায় যাতায়াতের উদ্দেশে বিশেষ ট্রেন/অতিরিক্ত কোচ বরাদ্দের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের যাতায়াতের জন্য ১০টি রুটে স্পেশাল ট্রেন পরিচালনা করা হবে এবং নিয়মিত চলাচলকারী একাধিক ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হবে। এ কারণে স্বল্প দূরত্বের রাজবাড়ী কমিউটার (রাজবাড়ী-পোড়াদহ), ঢালারচর এক্সপ্রেস (পাবনা-রাজশাহী) এবং রোহনপুর কমিউটার (রোহনপুর-রাজশাহী) ট্রেনের ২৫ ডিসেম্বরের যাত্রা স্থগিত রাখা হবে।
ওই ট্রেনগুলোর একদিনের জন্য যাত্রা স্থগিত করায় রুটগুলোতে যাত্রীদের সাময়িক অসুবিধার কারণে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।
যে ১০ রুটে চলবে স্পেশাল ট্রেন
কক্সবাজার-ঢাকা-কক্সবাজার, জামালপুর-ময়মনসিংহ-ঢাকা-জামালপুর, টাঙ্গাইল-ঢাকা-টাঙ্গাইল, ভৈরববাজার-নরসিংদী-ঢাকা-নরসিংদী-ভৈরববাজার,জয়দেবপুর-ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-জয়দেবপুর (গাজীপুর), পঞ্চগড়-ঢাকা-পঞ্চগড়, খুলনা-ঢাকা-খুলনা, চাটমোহর-ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-চাটমোহর, রাজশাহী-ঢাকা-রাজশাহী এবং যশোর-ঢাকা-যশোর। এছাড়া নিয়মিত চলাচলকারী একাধিক ট্রেনে চাহিদার ভিত্তিতে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হবে।
মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, এ বাবদ বাংলাদেশ রেলওয়ের আনুমানিক ৩৬ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হবে। স্পেশাল ট্রেন এবং অতিরিক্ত কোচে দলীয় নেতাকর্মীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা-২০২৫ প্রতিপালন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো গ্রেপ্তার হন। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য ১১ সেপ্টেম্বর লন্ডনে পাড়ি জমান। সেই থেকে তিনি পরিবার নিয়ে লন্ডনে অবস্থান করছেন। সেখানে থেকেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ অর্থ আত্মসাৎ মামলায় খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর ২০১৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে লন্ডনে বসেই বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
সূত্র: দি ডেইলি ক্যাম্পাস