জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকার গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলের লা ভিতা হলে তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার শীর্ষক অনুষ্ঠানে এনসিপি তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে।
ইশতেহারে এনসিপি যেসব বিষয় উল্লেখ করেছে, তাতে শুরুতেই রয়েছে জুলাই সনদের প্রসঙ্গ। পাশাপাশি, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে সংঘটিত সকল হত্যাকাণ্ড ও গুমের বিচারের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
এ ছাড়া, ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা, আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, চাঁদাবাজি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা, মেধাবীদের দেশে ফেরানোসহ মোট ১২টি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি রয়েছে ৩৬ দফার ইশতেহারে।
নির্বাচনের জন্য জামায়াত জোটে থাকলেও দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করে এনসিপি নেতারা বলছেন, নির্বাচনে জয় লাভ করলে তারা তাদের ইশতেহার বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ করা দলটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সাথে থেকে দলীয় ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দিলো, তা বাস্তবায়ন করা কি আদৌ সম্ভব? তাদের আলাদা ইশতেহারের কারণ বা প্রয়োজনই বা কী?
জামায়াতের সাথে থেকে আলাদা ইশতেহার কেন? ইশতেহার ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনেই দলের আলাদা ইশতেহার প্রসঙ্গে এ প্রশ্ন এসেছিল। জবাবে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানান, এনসিপির শেকড় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে। এনসিপির যাত্রা শুরুর সময় থেকেই তাদের প্রতিশ্রুতি ছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করার।
তাদের ঘোষিত ইশতেহার বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি রোধ হবে, গণতন্ত্র সুনিশ্চিত হবে, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হবে, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়া যাবে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে রক্ষা করে জাতীয় মর্যাদা নিয়ে বিশ্বের বুকে দাঁড়ানো যাবে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম জানান, এগুলো এনসিপির প্রাথমিক আকাঙ্ক্ষা ছিল।
তিনি জানান, তারা শুরু থেকেই যেসব দাবি জানিয়ে আসছিলেন, এখনও তারা একই দাবিতে আছেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারে থেকেও তারা তাদের সকল দাবি পূরণ করতে পারেননি।
‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আমাদের লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক পরিবর্তন। আমরা একটি নতুন সংবিধান চেয়েছিলাম। কিন্তু একটি কমিশনের মাধ্যমে এটার মধ্যস্ততা হয় এবং সেখানেও আমরা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূরণ করতে পারিনি। ফলে নতুন বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষাকে আমরা এখন দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা হিসেবে দেখছি’ বলেন নাহিদ ইসলাম।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে নির্বাচন করার পর দলের ইশতেহার বাস্তবায়ন কিভাবে সম্ভব, এমন প্রশ্ন নিয়ে নাহিদ বলেন, ‘পুরনো দলের সাথে জোট করার ফলে প্রশ্ন উঠছে যে এনসিপি তাদের লক্ষ্য থেকে সরে গেল কিনা। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে রাজনৈতিক জায়গায় ঐকমত্য রয়েছে এবং এটা মূলত নির্বাচনী জোট। আমাদের চেষ্টা থাকবে, এই ১১-দলীয় জোটের মাধ্যমে আমরা আমাদের সংস্কারের দাবি বাস্তবায়ন করবো। এই কারণে আমরা এনসিপির পক্ষ থেকে আলাদা ইশতেহার দিচ্ছি। জামায়াতে ইসলামী তাদের আলাদা ইশতেহার দেবে।’
এনসিপির ইশতেহার বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তাহলে? এর ব্যাখ্যায় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘যদি ১১-দলীয় জোট সরকার গঠন করে, তাহলে সরকারের ভেতরে এনসিপির যে অংশীদারিত্ব থাকবে, সেখানে এনসিপির এই দাবিগুলো প্রায়োরিটি লিস্টে থাকবে। আমরা সরকারের ভেতর থেকে সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবো। যেরকমটা আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের মাঝে থেকেও অনেককিছু বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি, আবার ব্যর্থও হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই জোট সরকার গঠন করলে কোনো নির্দিষ্ট দল তাদের নিজস্ব আদর্শ অনুযায়ী সরকার পরিচালনা করবে না। বরং, তারা সমন্বিতভাবে কাজ করবো এবং বিশেষ করে সংস্কার, বিচার, দুর্নীতি, আধিপত্যবাদের প্রশ্নে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবে। এই কারণেই এনসিপি তার নিজস্ব ইশতেহার দিচ্ছে, যা বাস্তবায়নে এনসিপি বদ্ধপরিকর...আর আমরা সরকারের অংশীদার হবো, কারণ আমরা জোট প্রক্রিয়ায় আছি।’
এনসিপি আহ্বায়ক আরও জানান, তাদের ইশতেহার বিচ্ছিন্নভাবে আসেনি। বরং, জুলাই অভ্যূত্থান থেকে শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন, জুলাই পদযাত্রা'র সময়ে বিশেষজ্ঞ ছাড়াও সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলার পর এগুলো এসেছে।