বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যারা শুরুতে ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ক্যাম্পেইন করেছিলেন, তারা এখন জনগণের উত্তাল তরঙ্গ দেখে একে একে অবস্থান পরিবর্তন করছেন। জনগণ আর পুরোনো, পচা ও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি চায় না। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক রাজনীতিকেও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। জনগণ দলীয় সরকার নয়, চায় জনগণের সরকার।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ময়মনসিংহ সার্কিট হাউস মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
জনসভায় জামায়াত আমীর বলেন, অনেকে এখন আস্তে আস্তে বলতে শুরু করেছেন আমরাও হ্যাঁ। ঠেলার নাম বাবাজী। তিনি বলেন, জনগণের চাপ ও আন্দোলনের কারণেই অনেকেই নিজেদের আগের অবস্থান ধরে রাখতে পারছেন না।
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘দেশের টাকা লুটপাট করে একটি চক্র প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে, যা বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের প্রায় চার গুণ। আল্লাহ যেন আমাদের তৌফিক দেন ওদের পেটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে সেই টাকা বের করে আনতে পারি। দেশের টাকা বিদেশে নিয়ে গিয়ে রাজকীয় জীবনযাপন করা আমরা মেনে নেব না। তাদের ঘুম হারাম করে দেব, দেশে ফিরিয়ে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’
তিনি বলেন, এই দেশে মুরগি বা গরু চুরির অভিযোগে সাধারণ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা বড় বড় চোরদের কোনো বিচার হয় না। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে এই বৈষম্য আর চলবে না, হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াত আমীর বলেন, এবারের নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি জাতিকে সঠিক পথে দাঁড় করানোর নির্বাচন। এবার দুটি ভোটই ‘হ্যাঁ’। হ্যাঁ মানে আজাদী, আর না মানে গোলামি। হ্যাঁ ভোট মা-বোনদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। প্রথম ভোটটি হ্যাঁতে দিন, দ্বিতীয় ভোটটি ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীকে দিয়ে ইনসাফ কায়েম করুন।
ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর দেশে কৃষিবিপ্লব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় গবেষণা বাজেট না থাকায় সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এরপরও এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের কৃষিখাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে এই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু এশিয়ায় নয়, বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
শিক্ষা খাত নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন জামায়াত আমীর। তিনি বলেন, শিক্ষাকে পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে এবং সারাদেশে শিক্ষাবাজেট লুটপাট করা হয়েছে। জাতি গঠনের জন্য ভালো শিক্ষা অপরিহার্য, যোগ করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই ৭৭ বছরে আমরা আগের ২৩ বছর ও পরের ৫৪ বছর দেখেছি। আমরা কি সেই পুরোনো রাজনীতি চাই? চাই না। তরুণ-তরুণী, এমনকি শিশুরাও তা চায় না। মা-বোনরাও চায় না। বাংলাদেশ পরিবর্তন চায়।’
ক্ষমতায় গেলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে প্রত্যেকটি বিভাগীয় শহরকে স্মার্ট নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান সমানভাবে নিশ্চিত করা হবে।
যুবসমাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যুবকরা কোনো দয়া বা অনুদান চায় না। ২০২৪ সালের আন্দোলনে তারা কি বেকার ভাতার জন্য জীবন দিয়েছে? না। তারা বলেছিল, আমরা কাজ করতে চাই, দেশ গড়তে চাই। আমরা যুবকদের হাতে অপমানজনক বেকার ভাতা তুলে দেব না; বরং প্রতিটি বেকার যুবকের হাতকে শক্তিশালী ও কর্মক্ষম করে তুলব, ইনশাআল্লাহ।’
এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ডা. শফিকুর রহমান মঞ্চে উঠলে দুই হাত নেড়ে সামনের সারিতে বসা জনতাকে অভিবাদন জানান। তখন মাঠজুড়ে স্লোগান ও করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ।
মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা কামরুল আহসান এমরুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় ময়মনসিংহের ১১টি সংসদীয় আসনে ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থীরাও বক্তব্য দেন। এর আগে সকাল থেকেই মিছিল ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ময়মনসিংহ নগরী।