ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জনপ্রত্যাশার বাংলাদেশ শীর্ষক এই ইশতেহারে ৩০টি দফা ও ১২টি বিশেষ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর পল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের আমির সৈয়দ রেজাউল করিম।
এ সময় সৈয়দ রেজাউল করিম জানান, তাদের ঘোষিত ইশতেহারের নাম দেওয়া হয়েছে জনপ্রত্যাশার ইশতেহার। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে জনপ্রত্যাশার উন্মেষ ঘটেছে, তা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত করার অঙ্গীকার থেকেই এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের পরিচালনা ও নীতি নির্ধারণ হয়। আর নির্বাচনের আগে ইশতেহারের মাধ্যমে জাতির সামনে রাজনৈতিক দলের নীতি-ভাবনা ও দেশ গঠনের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। সে ধারাবাহিকতায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের নীতি-ভাবনা, দেশ গঠনের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি জাতির সামনে তুলে ধরছে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইশতেহার জাতির সঙ্গে একটি প্রতিজ্ঞা। জনগণের সমর্থনে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে ইশতেহারের প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নে দলটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকবে ইনশাআল্লাহ।
ইশতেহার ঘোষণায় জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া একটি ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এতে দুই হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে ও হাজার হাজার মানুষ আহত হয়ে পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্বের শিকার হন। এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে।
এ সময় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী, আহত এবং আত্মত্যাগকারী সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানান তিনি।
যা আছে ৩০ দফা ইশতেহারে:
১. দেশের স্থায়ী শান্তি ও মানবতার সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন।
২. দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদকমুক্ত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
৩. সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সুশাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা।
৪. রাষ্ট্রপরিচালনায় সর্বত্র শরীয়াহর প্রধান্য।
৫. কৃষি ও শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে বেকার ও দারিদ্র্যমুক্ত এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ গঠন।
৬. নৈতিকতায় সমৃদ্ধ কর্মমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা।
৭. সার্বজনীন কর্মসংস্থান।
৮. পর্যায়ক্রমিক রাষ্ট্রসংস্কার।
৯. মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধতা।
১০. আর্থিক, সামরিক ও কূটনীতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
১১. নারী, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারসহ সকল জনগোষ্ঠীর মৌলিক ও মানবাধিকারের সুরক্ষা।
১২. রাষ্ট্র-সমাজ ও অর্থনীতিতে বৈষম্য বিলোপ।
১৩. সবার জন্য সাশ্রয়ী ও উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
১৪. পরিবেশ দূষণ রোধ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় গুরুত্ব।
১৫. ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহাবস্থান।
১৬. শুধু দুর্নীতি-সন্ত্রাস দমন নয়, নির্মূলকরণ কর্মসূচিও গ্রহণ করা হবে।
১৭. শুধু আইনের শাসন নয়, ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা।
১৮. জনমতের যথার্থ প্রতিফলন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠায় পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতি বাস্তবায়ন।
১৯. মানুষের সার্বিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ধর্ম ও রাজনীতির সমন্বয় করা।
২০. দুর্নীতি, সন্ত্রাস, খুন ও অনৈতিক পেশার সাথে জড়িতদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধকরণ।
২১. খুন, গুম, মিথ্যা, গায়েবী মামলা, জুলুম, নির্যাতন ও দুঃশাসনের বিলোপ।
২২. জনগণের বাক-স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
২৩. নারীদের শুধু সমঅধিকার নয়; অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।
২৪. শিল্প উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, স্যুয়ারেজ, আমদানী-রপ্তানী কার্যক্রমে ওয়ানস্টপ সার্ভিস কর্মসূচি গ্রহণ।
২৫. সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা।
২৬. কওমি মাদ্রাসায় ডিগ্রীধারীসহ দক্ষ ও যোগ্য ওলামায়ে কিরামকে সরকারী সুযোগের আওতাভূক্ত করা।
২৭. সড়ককে নিরাপদ করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২৮. বাংলাদেশকে ১৫ বছরের মধ্যে উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা।
২৯. শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা।
৩০. দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি রোধে সকল সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেয়া।
১২টি বিশেষ কর্মসূচি:
১. হতদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা নগদ সহায়তা।
২. প্রাথমিক স্তরের সকল শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন একবেলা পুষ্টিকর খাবার।
৩. ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুবকদের জন্য সুদমুক্ত ও জামানতবিহীন এককালীন ঋণ।
৪. সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বা স্বাস্থ্যকার্ড চালু, ভর্তুকিমূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও কৃষিকার্ড প্রবর্তন।
৫. ন্যাশনাল জব পোর্টাল, যেখানে দেশে ও বিদেশে চাকরি খোঁজা, পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের সুবিধা থাকবে।
৬. কর্মজীবী মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন।
৭. ঢাকাসহ সকল নগরে সরকার নিয়ন্ত্রিত ও ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক বাস ব্যবস্থাপনা।
৮. সেবাকেন্দ্রিক কর ব্যবস্থা চালু।
৯. সকলের জন্য নির্বিঘ্ন নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণ।
১০. নারী পোশাকশ্রমিকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা।
১১. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।
১২. কওমি সনদের স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রীয় পদে ওলামায়ে কেরামের পদায়ন।