জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন ঘিরে জোট রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের আভাস মিলছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জোট সঙ্গীদের প্রতি নমনীয় অবস্থান নিতে পারে—এমন ইঙ্গিত মিলেছে দলটির শীর্ষ পর্যায় থেকে। এর মধ্যে আলোচনায় রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যাদের জন্য এক বা একাধিক আসন ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা গুরুত্ব পাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
বর্তমানে জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে, যা সংবিধান অনুযায়ী দলগুলোর অর্জিত সাধারণ আসনের অনুপাতে বণ্টন করা হয়। ফলে কোনো দল এককভাবে সিদ্ধান্ত নিলেও জোট রাজনীতির বাস্তবতায় সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নাগরিক প্রতিদিনকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘বর্তমানে যে ৫০টি আসন রয়েছে, তা ভবিষ্যতে বাড়তে পারে। এসব আসনে আমরা নিজস্বভাবে প্রার্থী দিলেও জোটসঙ্গীদের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি মাথায় রাখছি।’
জোট রাজনীতির এই সমন্বয় প্রক্রিয়ায় এনসিপির নাম সামনে আসছে। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ‘নারী আসন বণ্টনে জোটের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো প্রক্রিয়া নেই। তবে জোটসঙ্গী হিসেবে জামায়াতে ইসলামী চাইলে তাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসতে পারে।’
সংসদে এনসিপির ছয়জন সদস্য থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে মনিরা শারমিন বলেন, ‘সে বিবেচনায় আমাদের প্রতিনিধিত্ব থাকা স্বাভাবিক।’ তার মতে, নারী নেতৃত্বকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ জোটের ভেতরে ভারসাম্য তৈরির পাশাপাশি দলটির সংসদীয় উপস্থিতিও শক্তিশালী করতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা লিখিত প্রতিশ্রুতি হয়নি। বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
জোটের এক দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারী প্রতিনিধিত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ‘অনেক নারী নেত্রী বিভিন্ন কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। ফলে নতুন ও সক্রিয় নেতৃত্ব খোঁজার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে,’ বলেন তিনি।
সূত্র আরও জানায়, এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব—নাহিদ ইসলাম, আরিফুল ইসলাম আদিব ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় ইতোমধ্যে কয়েকটি নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে। নারী শক্তির মুখ্য সংগঠক নুসরাত তাবাসসুমকে সম্ভাব্য মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া অতীতে জোটগত সমঝোতার কারণে আসন ছেড়ে দেওয়া ডা. মাহমুদা মিতুকেও ভবিষ্যতে বিবেচনায় রাখা হতে পারে, যদিও সেটি এখনো অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়েছে।
সংসদে এনসিপির ছয়টি আসনের বিপরীতে একটি আসনের জন্য মনিরা শারমিনের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহ দেখাননি তিনি। দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষার কথাই জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ শুধু আসন বণ্টনের বিষয় নয়, বরং জোট রাজনীতির নতুন কৌশলের ইঙ্গিত বহন করে। ছোট দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বড় দলগুলো রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে থাকে। এক্ষেত্রেও তেমন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, ‘এনসিপি মূলত তরুণদের একটি দল, যেখানে আন্দোলনঘনিষ্ঠ অনেক নারী নেত্রী রয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তৈরি হলে তারা সংসদে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ সংসদের কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের চিন্তা-ভাবনা তুলনামূলকভাবে আধুনিক ও সংস্কারমুখী, যা নীতিনির্ধারণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে এই সমন্বয় ভবিষ্যতে জোট রাজনীতির কাঠামোতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ও নারী নেতৃত্বকে সামনে আনার মাধ্যমে দলগুলো নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কৌশল হিসেবে এটিকে ব্যবহার করতে পারে। সংরক্ষিত নারী আসনকে কেন্দ্র করে জোটের ভেতরে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তা শুধু আসন বণ্টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কৌশল ও নেতৃত্ব বিন্যাসের দিকেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।