দেশের হাম পরিস্থিতি মহামারী আকার নিয়েছে। প্রতিদিনই শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে। এরমধ্যে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা তিনশ ছাড়িয়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১টি জেলায় এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং ইতিমধ্যে ৪৫ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া এবং সঠিক সময়ে টিকা সংগ্রহ না করতে পারাই বর্তমানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মূল কারণ।
অথচ এ বিষয়ে সতর্ক করে আগেই জানিয়েছিল ইউনিসেফ। এরকম একটি চিঠি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। চিঠিটি সরকারকে দেওয়া হয় ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। এর প্রাপক হিসেবে উল্লেখ করা হয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে। চিঠিটি পাঠান রানা ফ্লাওয়ার্স, প্রতিনিধি, ইউনিসেফ বাংলাদেশ।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আসন্ন সংকট সম্পর্কে ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখেই একটি চিঠির মাধ্যমে বিশেষ সতর্কতা প্রদান করেছিল। ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স প্রেরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে, আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় সময়সীমা বা ডেডলাইন অনেক আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে।
বিশেষ করে শিশুদের জন্য অতি জরুরি এমআর ৫ (MR5) ভ্যাকসিনের সময়সীমা গত ৫ ফেব্রুয়ারি পার হয়ে গিয়েছিল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাকসিনের সময়সীমাও ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ইউনিসেফ তখন স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় সামান্যতম বিলম্বও শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত করবে এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, যার প্রমাণ আমরা আজ দেশজুড়ে দেখতে পাচ্ছি।
এই সংকটের পেছনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা গ্যাভি (Gavi)-র শর্তাবলী অমান্য করার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বাংলাদেশ গ্যাভির সাথে পাঁচটি সহ-অর্থায়িত ভ্যাকসিন (Penta, PCV, HPV, TCV এবং MR) সংগ্রহের জন্য চুক্তিবদ্ধ, যা কেবল ইউনিসেফ সাপ্লাই ডিভিশনের মাধ্যমেই সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক। তবে সরকার বাজেটের বাকি ৫০ শতাংশ ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য নতুন 'ওপেন টেন্ডার মেথড' বা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বাস্তবায়নে প্রায় ৮ থেকে ১১ মাস সময় প্রয়োজন।
জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ অপেক্ষা বর্তমানের মতো মহামারী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যেখানে ইউনিসেফের 'ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড' ব্যবহার করলে মাত্র ২ থেকে ৪ মাসের মধ্যেই সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইউনিসেফ এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে ওপেন টেন্ডার পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করে সরাসরি সংগ্রহের পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং গ্যাভির শর্তানুযায়ী ইউনিসেফের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সাথে ভ্যাকসিনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ রক্ষায় 'ADB APVAX' চুক্তিতে দ্রুত স্বাক্ষর করা এবং আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
ইউনিসেফ জানায়, বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং এই মহামারী থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সঠিক বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই এখন সময়ের দাবি। ইউনিসেফ এই সংকট উত্তরণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে নিরলসভাবে কাজ করতে সদাসর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।