সুন্দরবনের নাম শুনলেই চোখে ভাসে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, শ্বাসমূলি গাছের মায়াজাল আর সতেজ বাতাস। কিন্তু পর্যটকদের আকর্ষণের এই শান্ত বনের গভীরে ওত পেতে থাকে মরণফাঁদ। গহীন সুন্দরবনের অসংখ্য সরু খাল আর চ্যানেলকে ঢাল বানিয়ে সক্রিয় রয়েছে ছয় থেকে আটটি বনদস্যু ও জলদস্যু বাহিনী।
জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় আর বন্যপ্রাণী শিকারের এই রমরমা সাম্রাজ্যে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। কোস্টগার্ডের অভিযানের মুখে দস্যু চক্রগুলো এখন চরম কোণঠাসা। আর ঠিক এই ক্ষোভ থেকেই সম্প্রতি কোস্টগার্ডের ওপর নেমে এসেছে অতর্কিত হামলা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি সুন্দরবনের ভেতরে কোস্টগার্ডের হারবারিয়া স্টেশনে ১১ জনের একদল দুষ্কৃতকারী আচমকা হামলা চালায়। এসময় কোস্টগার্ডের কয়েকজন সদস্য গুরুতর আহত হন। গোয়েন্দা সূত্রগুলোর দাবি, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে বনের সেই কোণঠাসা হয়ে পড়া জলদস্যু ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা।
কিন্তু কেন কোস্টগার্ডের ওপর এত বড় হামলা? স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মোংলার ‘জয়মনির ঘোল’ এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যু এবং তাদের গডফাদারদের লজিস্টিক সাপোর্ট ও রসদ সরবরাহের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কিন্তু ওই অঞ্চলে কোস্টগার্ড স্থায়ী স্টেশন স্থাপন করার পর থেকেই দস্যুদের খাবার, তেল, তথ্য এবং অবৈধ অস্ত্র সরবরাহের পথ বন্ধ হয়ে যায়। নিজেদের অপরাধের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় কোস্টগার্ডের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে সিন্ডিকেটটি।
বর্তমানে সুন্দরবনে সক্রিয় থাকা প্রতিটি দস্যু বাহিনীতে ৮ থেকে ১২ জন করে সশস্ত্র সদস্য রয়েছে। তবে দস্যুদের এই ছোট ছোট দলগুলোকে গুঁড়িয়ে দিতে কোস্টগার্ড মাঠে নামিয়েছে তাদের বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স। বনের নিরাপত্তা ও শান্তি ফেরাতে কোস্টগার্ড একযোগে চালাচ্ছে দুটি বিশেষ অভিযান—‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’। কোস্টগার্ডের অফিশিয়াল নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই দুই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪২টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। ৩৯ জন কুখ্যাত বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। দস্যুদের আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে জিম্মি ৪১ বনজীবী ও জেলেকে।
কোস্টগার্ডের তীব্র গোয়েন্দা তৎপরতা ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে বনের ভেতরের দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। কোস্টগার্ডের অভিযানে টিকতে না পেরে ইতোমধ্যেই স্বেচ্ছায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে আত্মসমর্পণ করেছে কুখ্যাত ‘ছোট সুমন বাহিনী’র প্রধানসহ কয়েকজন দুর্ধর্ষ দস্যু।
যদিও কোস্টগার্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুন্দরবনের ভৌগোলিক অবস্থান অপরাধ দমনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বনের হাজার হাজার সরু খাল আর ঘন চ্যানেলগুলো দস্যুদের এখনো ঝটিকা হামলা চালিয়ে চোখের পলকে আত্মগোপন করার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু সেই প্রতিকূলতাকেও হার মানাচ্ছে কোস্টগার্ডের পেশাদারিত্ব।
মোংলা বন্দরের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষা, সুন্দরবনের বিরল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নিরীহ জেলে-বাওয়ালীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ডের ভূমিকা আজ বনের বুকে আরেক ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোস্টগার্ড কর্মকর্তারা বলছেন, হারবারিয়া স্টেশনে হামলা চালিয়ে কোস্টগার্ডের মনোবল ভাঙা যাবে না, বরং দেশ ও জনগণের সুরক্ষায় গহীন অরণ্যের শেষ দস্যুটির পতন না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। এটাই কোস্টগার্ডের শপথ।