রাজধানীর গুলশানে বিটিএল গ্রুপের কর্ণধার মির্জা আবুল বাশার পুলিশের খাঁচায় বন্দি হতেই ভোল বদলে ফেলেছেন ছোট ভাই আলী আব্বাস। ভুক্তভোগীদের দাবি, কোটি কোটি টাকার প্রতারণার পেছনে জড়িত রয়েছে এই আব্বাস। অথচ আব্বাসের দাবি—তিনি বিটিএল গ্রুপের কোনো নীতিনির্ধারক নন, বরং মাত্র ২৫ হাজার টাকা বেতনের সাধারণ কর্মচারী! কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।
নথিপত্র ও ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, বিটিএল গ্রুপের সাথে দীর্ঘদিন সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন আলী আব্বাস। তিনি নিজেকে কখনো ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিতেন, আবার কখনো বসের চেয়ারে বসে জাহির করতেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা ‘এমডি’ হিসেবে।
কিন্তু নিজেকে ‘কর্মচারী’ দাবি করা এই আব্বাসের আসল রূপ উন্মোচিত হয় বাশারকে গ্রেপ্তারের দিন রাতেই। অভিযোগ রয়েছে, গুলশানের বাসায় যখন পুলিশি অভিযান চলছিল, তখন এই আব্বাসই পর্দার আড়াল থেকে মামলার বাদীকে বারবার ফোন করছিলেন। গ্রেপ্তারের হাত থেকে বড় ভাইকে বাঁচাতে ভুক্তভোগীকে লাখ লাখ টাকার টোপ এবং সমঝোতার প্রস্তাব দিচ্ছিলেন এই তথাকথিত ২৫ হাজার টাকার কর্মচারী!
বাশার-আব্বাসের প্রতারণার প্রমাণ দিতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন শামসুদ্দিন নামের এক যুবক। আলী আব্বাসের মিষ্টি কথা ও চতুরতার ফাঁদে পা দিয়ে নিজের জমানো টাকা এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে ধার-দেনা করে বিটিএল গ্রুপকে তেল সরবরাহ করেন তিনি।
প্রতি কেজি ১৮৯ টাকা দরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ লিটার সরিষার তেল সরবরাহ করেন শামসুদ্দিন। তেলের মোট দাম দাঁড়ায় ৩ লাখ ২ হাজার ৪০০ টাকা। তেল নেওয়ার পর বিটিএল গ্রুপ প্রথমে শামসুদ্দিনকে পরিশোধ করে মাত্র ৩০ হাজার টাকা। পরে অনেক ঘোরাঘুরির পর দেওয়া হয় আরও ২০ হাজার টাকা। বাকি প্রায় আড়াই লাখ টাকার জন্য শামসুদ্দিন দিনের পর দিন বিটিএল-এর দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও, তাকে শুধু দেওয়া হয়েছে আশ্বাস। আজ অথবা কাল দেব বলে তার পুরো ব্যবসাই লাটে তুলেছে এই বাশার সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কেবল সরিষার তেল নয়, কোরবানির পশু কেনাবেচা, বিভিন্ন বড় বড় ব্যবসায়িক লেনদেন, এমনকি আলোচিত দামী গাড়ি সংক্রান্ত জালিয়াতির সাথে জড়িত এই আলী আব্বাস।
ভুক্তভোগীরা জানান, টাকা আত্মসাতের পর কোনো পাওনাদার যদি তাদের ন্যায্য অর্থ ফেরত চাইতেন, অমনি শুরু হতো সিন্ডিকেটের নতুন খেলা। পাওনাদারদের ওপর উল্টো চাপ সৃষ্টি করতে শুরু হতো অনলাইন হয়রানি, দেখানো হতো আইনি নোটিশের ভয় এবং নানামুখী মানসিক চাপ দিয়ে ভুক্তভোগীদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হতো।
এই সমস্ত অভিযোগ নিয়ে আলী আব্বাসের বক্তব্য জানতে ‘নাগরিক প্রতিদিন’-এর পক্ষ থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। যদিও বড় ভাই গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বেশ কয়েকবার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন আব্বাস।
বর্তমানে বাশার আটক হওয়ার পর থেকেই ছোট ভাই আব্বাস পলাতক রয়েছেন। এমনকি বিটিএল গ্রুপের অফিসটিও এখন তালাবদ্ধ।
মির্জা আবুল বাশারকে ঘিরে প্রতারণার তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে এই পারিবারিক সিন্ডিকেটের নিত্যনতুন অপরাধের নথিপত্র।