হামলা আর দখলদারিত্বের অভিযোগ স্থানীয়দের
ময়মনসিংহের ভালুকা রেঞ্জ বন বিভাগের শত শত কোটি টাকার সরকারি জমি এখন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পকেটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ময়মনসিংহ-১১ আসনের সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চুর প্রভাবে চলছে বনভূমি দখল, ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা। সরকারি হাট-বাজারের ইজারা থেকে শুরু করে প্রতিটি ব্যবসা কেন্দ্রেই এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
লোকালয় কিংবা শিল্পাঞ্চল নয়, খোদ বন বিভাগের বিপুল পরিমাণ জমি দখল করে সেখানে রাতারাতি গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ বসতবাড়ি ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা।
সরজমিনে ওই এলাকা ঘুরে জানা গেছে, ভালুকা রেঞ্জের হবিরবাড়ি বিটের আওতাধীন মৌজার ১৯ নম্বর দাগে প্রায় ৭ একর, ২৭২ ও ২৭৫ নম্বর দাগে ১৪ একর, ৩২৩ নম্বর দাগে ৬ একর এবং ৪১৩ নম্বর দাগে ১৬ একর বনভূমি পুরোপুরি বেদখল হয়েছে। মেহেরাবাড়ি মৌজার ১২৭ নম্বর দাগে ৪ দশমিক পাঁচ শূন্য একর, ১৪৫ ও ১৫০ নম্বর দাগে ৬ একর, ১৬৮ নম্বর দাগে ৫ একর এবং ১০৯ নম্বর দাগে ৩ একর সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। পাড়াগাঁও মৌজার ২২৭ ও ২৯০ নম্বর দাগে দখল করা হয়েছে প্রায় ২ একর জমি। বনের বিভিন্ন দাগে এখনো অবৈধ নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দখলদাররা অত্যন্ত প্রভাবশালী। জনবল, নিরাপত্তা, আবাসন ও পরিবহন সংকটের কারণে নিয়মিত টহল দিতেও হিমশিম খাচ্ছে বন বিভাগ, যার ফলে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।
অভিযোগের তীর শুধু বনের জমি দখলেই সীমাবদ্ধ নয়। ফখর উদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চু এমপির আপন ভাতিজা আব্দুল্লাহ আল ফাহাদের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ পরিবারের বসতবাড়ি জোরপূর্বক দখল করে রাখার অভিযোগ রয়েছে। নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটি জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ফাহাদকে আটক করে, যদিও পরবর্তীতে সে জামিনে মুক্তি পেয়েছে।
একই সাথে এলাকায় কায়েম করা হয়েছে ত্রাসের রাজত্ব। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট এখন নিত্যদিনের ঘটনা। ১১ নম্বর রাজৈ ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফরিদের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে তাঁর একটি পা ভেঙে যায়। ভালুকা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক তিয়াস মাহমুদ শুভর বাসায় একাধিকবার সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও মালামাল লুট করা হয়েছে। হবিরবাড়ী ইউনিয়ন যুবদল নেতা মিজানের বাড়িতে হামলা চালিয়ে সর্বস্ব লুটে নিয়েছে প্রভাবশালী চক্র। গত ৩ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি প্রকাশের জের ধরে উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলমের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
শিল্পাঞ্চল ভালুকার মিল-ফ্যাক্টরি ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করাই এই সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য। জামিরদিয়া এলাকার একটি নামী গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেয়াকে কেন্দ্র করে এলাকায় চালানো হয় সশস্ত্র মহড়া এবং উল্টো রাজনৈতিক নেতাদের নামে মামলা দেওয়া হয়। এমনকি একটি ফিডমিলকে কেন্দ্র করেও হামলা ও প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চু‘র কোনো বক্তব্য মেলেনি। তার মুঠোফোনে কল এবং ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি ভালুকা মডেল থানায় গিয়েও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।