রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সম্পর্কটা এতদিন ছিল অবিচ্ছেদ্য। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর গ্যালারিতে তার নাম উচ্চারিত হয়েছে ভবিষ্যতের কিংবদন্তি হিসেবে। চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে গোল, প্রতিপক্ষের রক্ষণে আতঙ্ক, সাম্বার শৈল্পিকতা, মাঠের বাইরেও কোটি কোটি ইউরোর বাণিজ্যিক মূল্য—সব মিলিয়ে অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন, এই ব্রাজিলিয়ানই হবেন রিয়ালের পরবর্তী যুগের চেনা মুখ।
কিন্তু ফুটবলে চিরস্থায়ী বলে কিছু নেই। আর এখন সেই বাস্তবতাই যেন সবচেয়ে কঠিনভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কা এবং ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন ও ড্যাভিড অর্নেস্টাইনের একাধিক প্রতিবেদন কিংবা টুইটে উঠে এসেছে, ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন নিয়ে আর কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় লস ব্লাংকোসরা। ক্লাবের পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বশেষ কঠোর প্রস্তাবই চূড়ান্ত। সেটি গ্রহণ করলে নতুন চুক্তি হবে, আর না করলে চলতি গ্রীষ্মকালীন দলবদলেই তার জন্য ক্লাব ছাড়ার দরজা খুলে দেওয়া হবে চিরতরে।
একসময় যে খেলোয়াড়কে ঘিরে ভবিষ্যতের সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল রিয়াল, আজ তাকেই বিদায় বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্লাবটি! রিয়ালের অবস্থান স্পষ্ট—ভিনিসিয়ুসকে তারা চুক্তির শেষ বছরে প্রবেশ করতে দিতে চায় না। কারণ, এক বছর পর তিনি ফ্রি ট্রান্সফারে চলে গেলে শত শত মিলিয়ন ইউরোর সম্পদ একেবারেই বিনা মূল্যে হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। সেই ঝুঁকি নিতে রাজি নন ফুটবলের মাফিয়া খ্যাত ক্লাব সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।
তবে এই টানাপোড়েনের মূল কারণ বেতন নয়। দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু ‘সাইনিং বোনাস’ বা ইমেজ শেয়ার। বর্তমানে ব্যক্তিগত বোনাসসহ ভিনিসিয়ুসের বার্ষিক আয় প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ ইউরো। রিয়ালের সর্বোচ্চ বেতনসীমা প্রায় ২ কোটি ইউরো। অর্থাৎ মাসিক বেতন নিয়ে দুই পক্ষের দূরত্ব খুব বেশি নয়। কিন্তু পাঁচ বছরের চুক্তির মোট আর্থিক প্যাকেজ এবং সাইনিং বোনাসের অঙ্কেই তৈরি হয়েছে বড় বিভাজন।
রিয়ালের যুক্তি, ফ্রি ট্রান্সফারে আসা ফুটবলারের মতো বিশাল সাইনিং বোনাস তারা দিতে পারে না। অন্যদিকে ভিনিসিয়ুস ও তার প্রতিনিধিদের (এজেন্ট) দাবি, বর্তমান বাজারে তার মতো একজন খেলোয়াড় কিনতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো, তার তুলনায় তাদের দাবি মোটেও অযৌক্তিক নয়।
এই অচলাবস্থা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ কোপা আমেরিকার পর থেকেই শুরু হয়েছিল আলোচনা। মাসের পর মাস কেটে গেলেও কোনো পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। ফলে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে ইউরোপের কয়েকটি শীর্ষ ক্লাব। বিশেষ করে মিকেল আর্তেতার আর্সেনালের নাম আলোচনায় এসেছে সবচেয়ে বেশি। ইএসপিএনের তথ্য অনুযায়ী, ভিনিসিয়ুস যদি রিয়াল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তাকে দলে ভেড়ানোর দৌড়ে নিজেদের এগিয়ে রাখছে লন্ডনের ক্লাবটি। যদিও খেলোয়াড়ের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা শুরু হয়নি।
বিশ্বকাপ শেষে ছুটি কাটিয়ে আগামী সোমবার ভালদেবেবাসে প্রাক-মৌসুম অনুশীলনে যোগ দেওয়ার কথা ভিনিসিয়ুসের। কিন্তু মাঠে ফেরার আগেই তার ভবিষ্যৎ হয়ে উঠেছে স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
এদিকে দলবদলের বাজারেও বসে নেই লস মেরেঙ্গুয়েজরা। ইতোমধ্যে ফরোয়ার্ড কার্লোস এস্পিকে দলে টেনেছে ক্লাবটি। খুব শিগগিরই যোগ দিতে পারেন আইভরি কোস্টের তরুণ বিস্ময় তারকা ইয়ান দিওমান্দেও। ফলে আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুসের ওপর নির্ভরতা আগের মতো থাকবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। নতুন কোচ হোসে মরিনহোর পরিকল্পনাতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। যদিও দিওমান্দে রাইট উইং ও লেফট উইং দুপাশেই খেলতে পারেন। তবে তার মূল অবস্থান ভিনিসিয়ুসের জায়গাতেই। তাই তো প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।
যে ছেলেটি ২০১৮ সালে কিশোর বয়সে বার্নাব্যুতে পা রেখেছিল, সেই ভিনিসিয়ুস আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে গোল করেছেন, ২০২৪ ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও ভোটের বেড়াজালে রানার্সআপ হয়েছেন, অসংখ্য ম্যাচে একাই জিতিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদকে। তবু ফুটবলের নির্মম সত্য হলো, অতীতের অর্জন ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়; আবার যদি দলের নামটা হয় রিয়াল মাদ্রিদ, তাহলে তো কথাই নেই।
চুক্তির এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে ছাড় দেবে, তা এখনো অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বহু বছর পর রিয়াল মাদ্রিদ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে ক্লাবের সবচেয়ে বড় তারকার বিদায় আর কল্পনা নয়, এখন সেটি বাস্তব সম্ভাবনা।
লেখক
নবী নেওয়াজ
ক্রীড়া সাংবাদিক