প্রকাশিত : ২১ নভেম্বর ২০২৫, ৯:৫৮:৩৬
যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স'-এ তার অনুসারীদের দীপাবলির শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন গত মাসে। বিষয়টিতে চরম বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করেন যুক্তরাষ্ট্রের নেটিজেনরা।
কট্টর ডানপন্থী খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী এবং শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী অ্যাকাউন্টগুলো তার সেই পোস্টে বিদ্বেষপূর্ণ মিম আর কটু মন্তব্যের বন্যা বইয়ে দেয়। এমণ মন্তব্যও দেখা গেছে, ‘নিজের দেশে ফিরে যাও, তোমার বালির দানবদের পূজা করো।’ আরেকজন উত্তরে লিখেছেন, ‘আমার দেশ থেকে দূর হয়ে যাও।’ অন্য একজন মন্তব্য করেছেন, ‘এটা আমেরিকা। আমরা এসব করি না।’ যদিও এগুলো ছিল আক্রমণাত্মক মন্তব্যের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ‘ভালো’ উদাহরণ।
প্রাক্তন জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী বিবেক রামাস্বামী এবং নাগরিক অধিকার বিষয়ক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হারমিত ধিলনের দীপাবলি শুভেচ্ছার ক্ষেত্রেও একই ধরণের শত্রুতা দেখা গেছে। এমনকি হোয়াইট হাউস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এবং আরকানসাসের গভর্নর সারাহ হুকাবি স্যান্ডার্সের দীপাবলি বিষয়ক পোস্টগুলোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।
বিস্মিত ডানপন্থীরা
রাজনৈতিক ডানপন্থীদের একাংশরা ভারতীয়দের লক্ষ্যবস্তু করছে দেখে হতবাক হচ্ছেন মার্কিন বংশোদ্ভূত ভারতীয়রা। নির্বাচনের রাতে ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় পাওয়ার পর, রামাস্বামী রিপাবলিকানদের ‘পরিচয়ের রাজনীতি’ বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা আপনার গায়ের রঙ বা ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমরা আপনার চরিত্রের গুণাবলীকে গুরুত্ব দিই।’
এ ছাড়া, ‘ভারতীয়দের অস্তিত্বই বিরক্তিকর’ এমন এক মন্তব্যে বিস্মিত হন বর্ণবাদী ডানপন্থী ভাষ্যকার দীনেশ ডি’সুজাও। তিনি বলেন, ‘৪০ বছরের ক্যারিয়ারে এমন কথাবার্তা শুনিনি। ডানপন্থীদের এসব জঘন্য অবমাননাকর মন্তব্যের বৈধতা দিল কারা?’
রাষ্ট্রীয় বিদ্বেষ
এই ধরণের অপমানজনক কথাবার্তা নতুন নয়। তবে রাজনৈতিক ডানপন্থীদের মধ্যে এটি ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। একসময়ের প্রান্তিক ব্যক্তিত্বদের উত্থান এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রায় সব ধরণের অভিবাসনের ওপর কঠোর অবস্থানের কারণে, এমএজিএ( ট্রাম্পের মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন ক্যাম্পেইনের স্লোগান যা মাগা নামে পরিচিত) জোটের কিছু সদস্য এখন খোলাখুলিভাবেই বলছে কেবল শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানরাই আমেরিকার অংশ।
ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ-এর সম্পাদকীয় ব্যবস্থাপক ও বিশ্লেষক সিদ্ধার্থ ভেঙ্কটরামানকৃষ্ণান ভারত-বিদ্বেষ ও কট্টর ডানপন্থীদের নিয়ে গবেষণা করেন। তার মতে, ‘সমস্যাটা আসলে ঘরের ভেতর থেকেই তৈরি হচ্ছে।’
গত এক বছরে, 'সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট'-এর গবেষকরা এক্সে ভারত-বিদ্বেষী মনোভাবের এক তীব্র বৃদ্ধি নথিবদ্ধ করেছেন। যা কমার কোনো লক্ষণ নেই। এই কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রাকিব নায়েক জানান, তার দল শুধুমাত্র অক্টোবর মাসেই ভারতীয় ও ভারতীয় আমেরিকানদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ও জেনোফোবিয়া (বিদেশি ভীতি) প্রচারকারী প্রায় ২,৭০০টি পোস্ট রেকর্ড করেছে। এর কিছুটা কারণ হতে পারে ইলন মাস্কের প্ল্যাটফর্মটির রূপান্তর। আগে যেসব বর্ণবাদী বিষয়বস্তু মডারেটররা নিয়ন্ত্রণ করতেন, এখন সেগুলোকে উৎসাহিত ও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অনলাইনে সবচেয়ে ধারাবাহিক ভারত-বিদ্বেষ দেখা যায় এইচ-১বি ভিসা প্রোগ্রামকে কেন্দ্র করে, যার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলেন ভারতীয় নাগরিকরা। নায়েক এবং অন্যান্য গবেষকরা জানান, এই প্রোগ্রামটি (যা বিশেষায়িত ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য অত্যন্ত দক্ষ বিদেশীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেয়) ট্রাম্প সমর্থকদের মধ্যেও অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। স্টিফেন মিলারের মতো ভিসা বিরোধীরা ভারতকে ‘অভিবাসন নীতিতে প্রচুর প্রতারণা’ করার অভিযোগ করেছেন। সম্প্রতি ১,০০,০০০ ডলার আবেদন ফি আরোপ করে এইচ-১বি ভিসার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
বিদ্বেষের কারণ
কট্টর ডানপন্থী মার্কিনীরা নিয়মিতভাবে ভারতীয় অভিবাসীদের এমন প্রতারক হিসেবে অভিযোগ করছে। যারা আমেরিকানদের উচ্চ-বেতনের চাকরি থেকে বঞ্চিত করছে, এমনকি ভারতীয়দের নির্বাসনের দাবি জানাচ্ছে।
ভারতীয়দের তারা ‘সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে থাকা’ জাতি হিসেবে তুলে ধরেন। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো, নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনের সময়, প্রাক্তন ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোর স্বতন্ত্র প্রচারণা দল জোহরান মামদানিকে অগোছালোভাবে হাত দিয়ে ভাত খেতে দেখা যায় এমন একটি এআই-তৈরি আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিল।
বর্ণবাদী এবং অর্থনৈতিক ক্ষোভের এই প্রেক্ষাপটে, ভারতীয় আমেরিকানদের সাফল্য তাদের একটি সহজ লক্ষ্যে পরিণত করেছে বলে মনে করেন সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং কট্টর ডানপন্থী অনলাইন কমিউনিটি গবেষক রোহিত চোপড়া। পিউ রিসার্চ সেন্টারের আদমশুমারির তথ্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতীয় অভিবাসী এবং ভারতীয় আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আয়কারী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম। তারা সরকারের শীর্ষ পদে আসীন হয়েছেন এবং বিলিয়ন ডলারের কোম্পানির সিইও হয়েছেন। মিডিয়া, বিনোদন, প্রযুক্তি, ব্যবসা, চিকিৎসা এবং শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরে তাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
উদ্বেগজনক ঘৃণা
ইতিমধ্যেই অনলাইনে থাকা ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব দৈনন্দিন জীবনে ছড়িয়ে পড়ছে। হাজার হাজার ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবী বাস টেক্সাসের আর্ভিং-এ।সেখানে তিনজন মুখোশধারী ব্যক্তি রাস্তার পাশে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। যাতে লেখা— ‘আমার টেক্সাসকে ভারত বানাবেন না। এইচ-১বি ভিসা প্রতারকদের নির্বাসন দাও।’
ভার্জিনিয়ার স্প্রিংফিল্ডে বসবাসকারী ভারতীয় আমেরিকান সলিল মানিকতলা জানিয়েছেন, এই বছরের শুরুর দিকে এক বন্ধুর সাথে রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সময় তিনি একইভাবে হেনস্তার শিকার হন। এক ব্যক্তি তাকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করেন, বলেন ট্রাম্প এখন প্রেসিডেন্ট এবং তাকে ‘বাড়ি ফিরে যেতে’ ও দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য ‘ভরতনাট্যম করতে’ বলেন। ওই ব্যক্তি তাদের সহিংসতার হুমকিও দেন এবং বাইরে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এসব আতঙ্কে মানিকতলার বন্ধু পুলিশ ডাকতে বাধ্য হন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কখনৈ এসব বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি। জেডির স্ত্রী ঊষা ভ্যান্স একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান। অদ্ভুতভাবে তিনি তার সহকর্মীর কট্টর ভারতবিদ্বেষকে ‘তারুণ্যের ভুল বলে’ উড়িয়ে দিয়েছেন।
সরকারিভাবে এসব বিদ্বেষকে অগ্রাহ্য করা নিয়ে গবেষক রোহিত চোপড়া বলেন, ‘আমি মনে করি ভারতীয় আমেরিকান সম্প্রদায়ের একাংশ একটি বোকার স্বর্গে বাস করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এগুলোকে সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে কাজ করা উচিত। যে বর্ণবাদ অশ্বেতাঙ্গ এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত হয়, আপনারা তা থেকে মুক্ত নন।’