প্রকাশিত : ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ৭:০৭:১৩
‘থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিজ’, অর্থাৎ তথাকথিত দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে আসা সব অভিবাসন স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ-এ এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। তার এই সিদ্ধান্ত পুরো বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা, চাকরি ও উন্নত জীবনের খোঁজে পাড়ি জমান।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল গার্ডের দুই সেনাকে গুলি করেন এক আফগান নাগরিক। তিনি আফগানিস্তানে থাকা অবস্থায় মার্কিন সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা—সিআইএ’র সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০২১ সালে যখন তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয় তখন তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের বিশেষ ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে যান। এরমধ্যে গতকাল সেনাদের ওপর গুলির ঘটনার পর পুরো অভিবাসন ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে। এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি এমন ঘোষণা দিলেন।
ট্রাম্প তার সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝেড়েছেন। তবে আফগানিস্তান ছাড়া দীর্ঘ পোস্টে আর কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি। কেবল জানিয়েছেন, ‘তৃতীয় বিশ্ব’র দেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল বাংলাদেশও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে সুপারিশ পেয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে নভেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবে।
সে হিসেবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর বাংলাদেশের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে—তা নিয়ে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। তবে এরও আগে প্রশ্ন উঠেছে—‘তৃতীয় বিশ্ব’র দেশ আসলে কারা?
মূলত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-কেন্দ্রিক দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায় গোটা বিশ্ব। শুরু হয় পুঁজিবাদী ও সমাজবাদী ঠান্ডা লড়াই। এ সময়ে পুঁজিবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী মার্কিন নেতৃত্বাধীন দেশগুলোকে ‘প্রথম বিশ্ব’ এবং সমাজবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন দেশগুলোকে ‘দ্বিতীয় বিশ্ব’ বলা হতো। যেসব দেশ এই দুয়ের কোনো পক্ষেই ছিল না, তারা হয়ে গিয়েছিল ‘তৃতীয় বিশ্ব’। ভারত, বাংলাদেশ, আফগানিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও সেই সময়ে ‘তৃতীয় বিশ্বের’ দেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশ্বের ধারণা পাল্টেছে।
‘তৃতীয় বিশ্ব’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশের তালিকা নেই। তবে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অনেকে ‘তৃতীয় বিশ্ব’র দেশ বলে উল্লেখ করে থাকে। এসব দেশে উৎপাদন-আয় কম, অস্থিরতা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। তবে মূল ‘তৃতীয় বিশ্ব’র ধারণার সঙ্গে দারিদ্র বা সংঘাতের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। মনে করা হচ্ছে, ট্রাম্প ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’ বলতে এ ধরনের দেশগুলোকেই বোঝাতে চেয়েছেন। এশিয়া ও আফ্রিকার একাধিক দেশ সেই তালিকায় থাকতে পারে। থাকতে পারে আফগানিস্তানও।
ট্রাম্পের এমন ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের অন্যান্য নীতিগত লক্ষ্য—যেমন প্রকল্প ২০২৫-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই প্রকল্পে ব্যাপক অভিবাসী বহিষ্কার, বৈধ অভিবাসন সীমিতকরণ ও জো বাইডেন সরকারের সময়ে অনুমোদিত অভিবাসন বাতিলের পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি বাইডেন প্রশাসনের অনুমোদিত ‘লাখ লাখ প্রবেশাধিকার’ বাতিল করবেন, অ-নাগরিকদের ফেডারেল সুবিধা বন্ধ করবেন এবং দেশে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করা বা ‘উপকারবিহীন’ অভিবাসীদের বহিষ্কার করবেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিবাসন নীতির ঘোষণার দিনেই ৩৯ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের অধিকাংশই বৈধ ভিসায় ব্রাজিলে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন। এরপর সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন ৩৪ বাংলাদেশি। আর বাকি পাঁচজনের মধ্যে দুজন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনজন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। এছাড়াও চলতি বছরে ১৮৭ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন।
২০২৪ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা ২২০ ছাড়িয়েছে। মার্কিন আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানকারী অভিবাসীদের আদালতের রায় বা প্রশাসনিক আদেশে দেশে ফেরত পাঠানো যায়। আশ্রয়ের আবেদন ব্যর্থ হলে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ (আইসিই) তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রক্রিয়া দ্রুততর করার কারণে চার্টার্ড ও সামরিক ফ্লাইটের ব্যবহার বেড়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসীদের তাড়াতে কঠোর হয়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় একাধিক দফায় বাংলাদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিককে হাতকড়া পরিয়ে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এতে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন ট্রাম্প। শুক্রবার ট্রুথ সোশ্যালে এয়ারক্রাফটে ডজন ডজন আফগান অভিবাসীর ছবিযুক্ত পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘এটা আফগানিস্তান থেকে ভয়াবহ এয়ারলিফটেরই একটি অংশ। লাখ লাখ মানুষ কোনো যাচাই–বাছাই ছাড়াই আমাদের দেশে ঢুকে পড়েছিল। আমরা এটা ঠিক করব, কিন্তু কুটিল জো বাইডেন আর তার লোকেরা আমাদের দেশের সঙ্গে যা করেছে, তা কখনো ভুলব না!’
ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপের প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপরেও। প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ও পড়াশোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা আরও যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিউইয়র্কে বসবাসকারী এক বাংলাদেশি নাগরিক জানান, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘অনেক বাংলাদেশি খুব প্রয়োজন না হলে বাইরে বেরোনো এড়িয়ে চলছেন। কেউ কেউ কয়েক মাস ধরে স্থানীয় বাজারেও যাননি।’
যদিও আইনি কাগজপত্রধারী ব্যক্তিরা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন না, তবুও তারা উদ্বিগ্ন বলে অন্তত আরও দুজন বাংলাদেশি জানিয়েছেন।
অনানুষ্ঠানিক বা অসমর্থিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন এবং তাদের ১০ ভাগের ১ ভাগ নথিভুক্ত নন।
এর আগে বাংলাদেশের ক্ষতির ব্যাখ্যায় সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আসা দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে অন্যতম। ফলে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। আবার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা আরও যাচাই-বাছাই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ এক নিবন্ধে লেখেন, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরায় অভিবাসন প্রসঙ্গে বোধহয় বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। তার প্রধান লক্ষ্য—দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা হিস্পানিক অভিবাসন ঠেকানো। হিস্পানিক অভিবাসন বেড়েছে আমেরিকায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করতে চাচ্ছেন। বৈধ অভিবাসন বন্ধ করার কথা তিনি বলছেন না। আমেরিকা অভিবাসন ছাড়া টিকতে পারবে না। এই জায়গা থেকে বাংলাদেশের বিশেষ কোনো উদ্বেগের কারণ নেই। আমাদের বেশিরভাগই বৈধ অভিবাসন। বৈধ অভিবাসন পদ্ধতি থাকলে অবৈধ অভিবাসন যেকোনো দেশ ঠেকাতে চাইতেই পারে।