লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ঢুকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসা কোনো সাধারণ বাহিনীর পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। তবে এই দুঃসাহসী কাজটি করেছে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রথম স্পেশাল ফোর্সেস অপারেশনাল ডিটাচমেন্ট-ডেল্টা, সংক্ষেপে যারা ডেল্টা ফোর্স বা ‘দ্য ইউনিট’ নামে পরিচিত। এলিট ফোর্সটি সর্বোচ্চ চৌকস কমান্ডোদের নিয়ে গঠিত। চলুন তবে দেখে নেওয়া যাক এই ভয়ংকর ইউনিটটি সম্পর্কে কিছু অজানা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে নেওয়া যাক।
প্রশিক্ষণের কঠোরতা: লাখে একজন
ডেল্টা ফোর্সে যোগ দেওয়ার কোনো সরাসরি নিয়োগ প্রক্রিয়া নেই। নিয়মিত সেনাবাহিনী বা গ্রিন ব্যারেট (Green Berets) থেকে কয়েক বছর অভিজ্ঞ সেনাদের মধ্য থেকে বাছাই করা হয়। এদের নির্বাচন প্রক্রিয়া এতটাই কঠিন যে, ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রার্থী মাঝপথেই ছিটকে পড়েন। যারা টিকে থাকেন, তারা কেবল শারীরিক যোদ্ধা নন, তারা এক একজন উচ্চ বুদ্ধিসম্পন্ন ‘কৌশলবিদ’।
অপ্রতিরোধ্য গতি ও গোপনীয়তা
ডেল্টা ফোর্সের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের নিঃশব্দ চলাচল। এরা রাডারকে ফাঁকি দিয়ে কয়েকশ ফুট উচ্চতায় হেলিকপ্টার থেকে নামতে পারে। ভেনেজুয়েলার মতো হাই-ভ্যালু অপারেশনে এরা সাধারণত ‘ব্ল্যাক হক’ বা ড্রোন ব্যবহার করে পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা জ্যাম করে দেয়। শত্রু কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা লক্ষ্য হাসিল করে ‘হাওয়া’ হয়ে যায়।
উন্নত সমরাস্ত্র ও এআই প্রযুক্তি
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ডেল্টা ফোর্স কেবল গানপাউডারের ওপর নির্ভরশীল নয়। অপারেশনে জন্য তাদের ‘ভান্ডারে’ রয়েছে অসাধারণ কিছু কৌশলী রসদ। এর মধ্যে অন্যতম হলো-
স্মার্ট হেলমেট: তাদের হেলমেটে এমন সেন্সর থাকে যা দেওয়ালের ওপাশে থাকা মানুষের হৃদস্পন্দনও শনাক্ত করতে পারে।
ন্যানো ড্রোন: তারা মশার মতো ছোট ড্রোন ব্যবহার করে শত্রুর ঘরের ভেতরের দৃশ্য সরাসরি দেখতে পায়।
নিখুঁত লক্ষ্যভেদ: ডেল্টা ফোর্সের একজন স্নাইপার কয়েক মাইল দূর থেকেও শত্রুর অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেন।
কেন তারা সবচেয়ে ভয়ংকর?
সিভিলিয়ান অ্যাপিয়ারেন্স: ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা লম্বা চুল বা দাড়ি রাখেন এবং সাধারণ পোশাকে চলাফেরা করেন। ফলে মিশনে যাওয়ার আগে তারা সহজেই সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
মানসিক কাঠিন্য: জিম্মি উদ্ধার বা হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের বন্দি করার সময় তারা সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তারা প্রশিক্ষিত এমনভাবে যে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাদের হাত কাঁপে না।
ব্যর্থহীন ইতিহাস: সাদ্দাম হোসেনকে গর্ত থেকে বের করে আনা কিংবা আবু বকর আল-বাগদাদির ডেরায় হামলা—সবখানেই ডেল্টা ফোর্সের সফল পদচিহ্ন রয়েছে।
ভেনেজুয়েলা মিশন: ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ
নিকোলাস মাদুরোকে তার নিজের দেশ থেকে তুলে নেওয়া প্রমাণ করে যে, ডেল্টা ফোর্সের কাছে কোনো দেশের প্রতিরক্ষা দেওয়ালই নিরাপদ নয়। তারা এমন এক ইউনিট, যারা আইনি বাধা বা সীমানার তোয়াক্কা না করে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশে কাজ করে।
যেকোনো দেশের জন্য ডেল্টা ফোর্স একটি মূর্তমান আতঙ্ক। ভেনেজুয়েলার এই ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করল। ডেল্টা ফোর্সের এই অপারেশন প্রমাণ করল যে, আধুনিক যুদ্ধে জয়ী হতে বিশাল সেনাবাহিনীর চেয়ে মুষ্টিমেয় কিছু ‘সুপার সোলজার’ অনেক বেশি কার্যকর।