লিওনেল মেসি যখন নিজের সেরাটা মেলে ধরেন, তখন প্রতিপক্ষের জন্য ম্যাচটা শুধু কঠিনই হয় না, প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে কানসাস সিটির ম্যাচে ঠিক সেটাই দেখা গেল। মাঠে যেন একজন মেসি ছিলেন আর অন্য পাশে পুরো আলজেরিয়া।
ম্যাচের মাত্র ৫ মিনিটেই অফসাইডের কারণে একটি গোল বাতিল হয়েছিল তার। কিন্তু সেটাই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। এরপর ১৭, ৬০ ও ৭৬ মিনিটে তিনবার আলজেরিয়ার জালে বল জড়িয়ে বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এর মধ্যে দুটি গোল ছিল বক্সের বাইরের দুর্দান্ত শট থেকে।
মেসির এই অসাধারণ পারফরম্যান্সে ৩-০ গোলের জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচ শেষে সবচেয়ে আলোচনার বিষয় ছিল না স্কোরলাইন, ছিল একজন ফুটবলারের মহিমা।
মেসিকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যেন ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না তার সতীর্থরাও। আলেক্সিস ম্যাক এলিস্টার বলেন, ‘তাকে (মেসি) বর্ণনা করার মতো কোনো শব্দ আর বাকি নেই। আজ এটা স্পষ্ট যে লিও (মেসি)-ই সবার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এমন একটি দল গড়ার চেষ্টা করি যাতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন।’
ম্যাচটি আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়ার চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছিল মেসি বনাম আলজেরিয়া। তার জাদুকরী হ্যাটট্রিকের পর প্রশংসায় ভাসিয়েছেন ফাকুন্দো মেদিনাও। তিনি বলেন, ‘মেসি সবকিছু খুব সহজ করে তোলে, আমরা প্রতিদিন তা দেখছি। নতুন করে আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই, সে কেমন (খেলোয়াড়) তা সবাই জানে। এখন, আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে।’
প্রথম গোলটির পেছনেও ছিল রদ্রিগো দি পলের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আলজেরিয়ার চার ফুটবলারকে কাটিয়ে দেওয়া তার পাস থেকে গোলের কাজটি শেষ করেন মেসি। ম্যাচ শেষে দি পল বলেন, ‘লিওকে দলে পাওয়া অনেক বড় সুবিধা। কারণ, তিনি যেভাবে পুরো দলকে সামলান এবং সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান, তা অনন্য। তিনি ঠিক যেমন মানুষ, তাঁর ব্যক্তিত্বের কারণেই এমনটা সম্ভব। তিনি ব্যক্তিগত রেকর্ডের পরোয়া করেন না। সব সময় দলকে প্রাধান্য দেন এবং আমাদের জন্য এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য।’
বিশ্বকাপ শুরুর আগে চোটে জর্জরিত ছিল আর্জেন্টিনা শিবির। তবে সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে দলটি এখন আত্মবিশ্বাসী। মাক আলিস্তার বলেন, ‘যদিও বেশ কিছু চোটের সমস্যা ছিল। তবু আমাদের ঘাটতিগুলো শুধরে নেওয়ার এবং নিজেদের সেরা অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় ছিল। আশা করি, এটি একটি দারুণ বিশ্বকাপ হবে।’
এই হ্যাটট্রিক শুধু একটি ম্যাচের গল্প নয়, এটি রেকর্ড বইয়ের নতুন অধ্যায়ও। বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো হ্যাটট্রিক করেই মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন মেসি। এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন তারা।
আরও একটি অনন্য কীর্তিও গড়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হিসেবে হ্যাটট্রিকের রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন তিনি। এতদিন এই রেকর্ড ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দখলে।
একটি রাত, তিনটি গোল, অসংখ্য রেকর্ড—আর সতীর্থদের মুখে একটাই স্বীকারোক্তি, মেসিকে বর্ণনা করার মতো শব্দ হয়তো সত্যিই ফুরিয়ে এসেছে।