আগামী বছরের মার্চে হতে যাওয়া ফিফা সভাপতি নির্বাচনে চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য লড়তে চান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। কিন্তু নির্বাচনের আগেই নিজের অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছিলেন বিশ্ব ফুটবলের এই শীর্ষ কর্তা। বিশ্বকাপের বিপুল মুনাফার অংশ নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রির পরিকল্পনা ঘিরে যে ঝড় উঠেছিল, তাতে নড়ে গিয়েছিল ইনফান্তিনোর ক্ষমতার ভিত।
‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)’ নামে একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব ও মুনাফার অংশ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করেছিলেন ইনফান্তিনো। প্রস্তাব অনুযায়ী, এর লাভের অংশ পাওয়ার সুযোগ থাকার কথা ছিল ফিফার সদস্য দেশগুলোরও। কিন্তু পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। ফুটবল মহলে ওঠে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, এমনকি ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অনেকেই মনে করছিলেন—দীর্ঘদিনের ক্ষমতার মসনদ এবার হয়তো টলেই যাবে ইনফান্তিনোর। ইউরোপের কয়েকটি ফুটবল সংস্থা ও ফিফার অভ্যন্তরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এ পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি তোলেন। এমনকি ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গারও জানান, প্রস্তাবিত উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি আগে কিছুই জানতেন না।
তবে সংকটের চূড়ান্ত মুহূর্তে কৌশল বদলান ইনফান্তিনো। মরক্কোর রাজধানী রাবাতে জরুরি বৈঠক ডেকে ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন তিনি। বৈঠকের পর ফিফা জানায়, বিতর্কিত এফএফই পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগের প্রক্রিয়ায় ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করে সদস্য দেশগুলোর কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই বৈঠকেই ইনফান্তিনোর প্রতি আবারও আস্থা প্রকাশ করেন ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তারা। মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রমসহ ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্যরা তার নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। এর মাধ্যমে আপাতত নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিশংসনের শঙ্কা কাটিয়ে উঠেছেন ফিফা সভাপতি।
গ্রাফস্ট্রমের সমর্থন ইনফান্তিনোর জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর আগে কর্মীদের কাছে পাঠানো এক ই-মেইলে তিনি সাম্প্রতিক ঘটনাকে ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। ফলে তার অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছিল নতুন জল্পনা। তবে ফিফা জানিয়েছে, ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রম উভয়েই একে অপরের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন।
তবে ঝড় পুরোপুরি থেমে যায়নি। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর সংগঠন ‘ইউরোপিয়ান লিগস’ ইতোমধ্যে ফিফার পরিচালন পদ্ধতিতে বড় ধরনের সংস্কারের দাবি তুলেছে। সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা ও সিরি আ’র মতো বিশ্বের শীর্ষ প্রতিযোগিতাগুলো। তাদের দাবি, এফএফই পরিকল্পনা দেখিয়েছে ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা ও অংশীদারদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
ইউরোপিয়ান লিগসের মতে, ফুটবলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সব পক্ষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এমনকি ফিফার সম্ভাব্য ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে তারা।
সব মিলিয়ে ইনফান্তিনো আপাতত নিজের চেয়ার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু সমালোচনার যে আগুন জ্বলেছে, তা এখনো পুরোপুরি নেভেনি। মার্চের নির্বাচনের আগে তাকে শুধু সদস্য দেশগুলোর সমর্থনই নয়, ফিফার ভেতরের আস্থা এবং ফুটবল বিশ্বের সমালোচনাও সামলাতে হবে। তার চতুর্থ মেয়াদের পথ এখনো খোলা, তবে সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় রাজনৈতিক লড়াই।