ইউরোপীয় ফুটবলে এমন রাত খুব কমই আসে, যখন ঘড়ির কাঁটা থামিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। একসঙ্গে ১৮টি ম্যাচ, ৩৬টি দল, আর প্রতিটি গোলের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ভাগ্য। চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বের শেষ রাতে তাই ফুটবল সমর্থকদের চোখ থাকবে একাধিক স্ক্রিনে। কোথাও শেষ আটের উৎসব, কোথাও প্লে-অফে বাঁচা-মরার লড়াই, আবার কোথাও নিশ্চিত বিদায়ের হতাশা।
এই পাগলাটে রাতটা অবশ্য সবার জন্য সমান নয়। ইউরোপ সেরার মঞ্চে শুরু থেকেই যারা দাপট দেখিয়েছে, তাদের হিসেব অনেকটাই সোজা। সব ম্যাচ জিতে শীর্ষে থাকা আর্সেনাল কার্যত নিশ্চিত করেই রেখেছে লিগ পর্বের প্রথম স্থান। কাজাখস্তানের কাইরত আলমাতির বিপক্ষে তাই গানারদের ম্যাচটা কেবল আনুষ্ঠানিকতা। একইভাবে আগেভাগেই শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে বায়ার্ন মিউনেখ। শেষ রাউন্ডে ডাচ ক্লাব পিএসভি আইন্দোভেনের বিপক্ষে নামবে তারা নির্ভার মনেই।
কিন্তু এই নিশ্চিন্ততার বাইরে রয়েছে বিশাল এক যুদ্ধক্ষেত্র। কাগজে-কলমে এখনও ১৬টি ক্লাবের সামনে সুযোগ আছে শীর্ষ আটে থেকে লিগ পর্ব শেষ করার। পিএসজি, রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, সকল নামের জৌলুসে ভরা এই ক্লাবগুলো নকআউট নিশ্চিত করলেও এখন তাদের লক্ষ্য একটাই: বাড়তি প্লে-অফ এড়িয়ে সরাসরি শেষ ষোলো নিশ্চিত করা।
এখন পর্যন্ত ১৫টি দল নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে। বাকি ৯টি জায়গার জন্য লড়ছে ১৭টি ক্লাব। পয়েন্ট টেবিলের ৯ থেকে ২৪, এই অঞ্চলে যে কেউ রাত শেষে হাসতে পারে, আবার যে কেউ হারিয়ে যেতে পারে অঙ্কের জটিলতায়। শুক্রবারের প্লে-অফ ড্রয়ের আগে তাই প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি গোল ভীষণ মূল্যবান।
শীর্ষ আটের দৌড়ে রিয়াল মাদ্রিদ, লিভারপুল আর টটেনহ্যামের সমীকরণ তুলনামূলক সহজ। জিতলেই কাজ শেষ। বেনফিকার মাঠে রিয়াল, কারাবাখের বিপক্ষে, অ্যানফিল্ডে লিভারপুল, আর আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের মাঠে টটেনহ্যাম জয় পেলেই সরাসরি শেষ ষোলো নিশ্চিত।
কিন্তু পয়েন্ট টেবিলের ৬ থেকে ১২ নম্বর স্থানে থাকা দলগুলোর জন্য রাতটা নিঃশ্বাস আটকে রাখা এক লড়াই। আটটি দলেরই পয়েন্ট ১৩। নিজেদের ম্যাচ জেতা যেমন জরুরি, তেমনি কান পেতে থাকতে হবে অন্য মাঠের স্কোরলাইনের দিকেও।
পিএসজি ও নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মুখোমুখি হওয়া ম্যাচটি যেন অলিখিত নকআউট। জয়ী দল সরাসরি পরের ধাপে যাবে, হারলে অপেক্ষা করবে প্লে-অফের অনিশ্চয়তা। ড্র হলে দু’দলকেই তাকিয়ে থাকতে হবে অন্য ম্যাচের ফলের দিকে।
সমান পয়েন্ট নিয়ে একই স্বপ্ন দেখছে চেলসি, বার্সেলোনা, স্পোর্টিং, ম্যানচেস্টার সিটি, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ও আটালান্টা। নাপোলির মাঠে জিতলেই চেলসির শেষ ষোলোতে ওঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল, যদিও গোল ব্যবধানের হিসাব ভোগাতে পারে। কোপেনহেগেনের বিপক্ষে বড় জয়ে বার্সেলোনা সরাসরি যেতে পারে, আর গালাতাসারাইকে হারাতেই হবে সিটিকে, না হলে পেপ গুয়ার্দিওলার দলকেও নামতে হতে পারে প্লে-অফে। সেই ম্যাচে গালাতাসারাইয়ের জন্যও সমীকরণ পরিষ্কার—জয় মানেই বেঁচে থাকা।
নরওয়ের বোডো/গ্লিম্টের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে জয় অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের জন্য খুলে দিতে পারে শেষ ষোলোর দরজা। একই পথে হাঁটতে চাইবে আটালান্টাও, যদিও তাদের তাকিয়ে থাকতে হবে অন্য ম্যাচগুলোর দিকেও।
আর নিচের দিকে? সেখানে বেঁচে থাকার যুদ্ধ আরও নির্মম। সাবেক ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন বেনফিকা ও আয়াক্স বিদায়ের কিনারায়। সাত ম্যাচে মাত্র দুই জয় নিয়ে বেনফিকা আছে ২৯ নম্বরে, আয়াক্স ৩২ নম্বরে। রিয়াল মাদ্রিদকে হারানো ছাড়া বেনফিকার সামনে কার্যত কোনো রাস্তা নেই, তাতেও ভরসা রাখতে হবে অন্যদের ফলের ওপর। আয়াক্সেরও অলিম্পিয়াকোসের বিপক্ষে জয় জরুরি, তারপর শুরু হবে অপেক্ষা।
এক রাত, ১৮ ম্যাচ, অসংখ্য সমীকরণ। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এই রাত শেষে কেউ পাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস, কেউ নামবে অজানা প্লে-অফের পথে, আর কেউ বুঝে নেবে, ইউরোপের স্বপ্নটা এখানেই শেষ।