অনুষ্ঠানটি ছিল ছোট পরিসরের হলেও তা ছিল গভীর ভাবনাচিন্তার মঞ্চ।
ঢাকার ঘুমন্ত শহর গভীর রাতে যেন এক ঝলক আলো ও হাততালির আওয়াজে জেগে ওঠে। হাতিরঝিলের অ্যাম্ফিথিয়েটার মঞ্চে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের সদস্যরা উঠে আসেন, ক্লান্ত মুখে কিন্তু দমে না যাওয়া এক দৃঢ়তায়। মিয়ানমারকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের টিকিট নিশ্চিত করার পর তাঁদের এ ফেরাটা ছিল এক ধরনের বীরত্বগাঁথা।
রাত দেড়টায় বিমানবন্দর থেকে সরাসরি আনা হয় মেয়েদের। হাজার হাজার দর্শক হাতে বাংলাদেশ ধ্বনি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। মঞ্চে একে একে ডাকা হয় রুপণা চাকমা, শিউলি, শামসুন্নাহার, আফঈদারা, তহুরা, কোহাতি, মনিকা, মারিয়া, ঋতু এবং দলের অন্যান্য সদস্যদের। ফুলের তোড়ায় বরণ করে নেয়া হয় মেয়েদের।
ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ডিজিটাল যুগের ছোঁয়া নিয়ে সাজিয়েছে অনুষ্ঠানস্থল, বড় পর্দায় দেখানো হয়েছে মিয়ানমার ম্যাচের খণ্ডচিত্র। তবে চোখে পড়ে না কোনো অর্থ বা পুরস্কারের প্রতীক; আলো আর সাদরে অভিনন্দন দিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল স্বীকৃতি।
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল বলেন, “আপনারা নতুন করে ইতিহাস লিখছেন এবং সমাজের মনোভাব বদলের যাত্রায় এগিয়ে নিচ্ছেন। আমরা আপনাদের পেছনে আছি।” কিন্তু নগদ পুরস্কারের অনুপস্থিতি দর্শকদের মধ্যে কিছুটা হতাশা তৈরি করেছে।
মেয়েদের অধিনায়ক ঋতুপর্ণা দাস বলেন, “ফুটবল কোনো ব্যক্তিগত খেলা নয়, এটা টিমওয়ার্ক। আমরা জানি কীভাবে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়। আপনারা আমাদের বিশ্বাস রাখবেন, আমরা আপনাদের নিরাশ করব না। আমাদের লক্ষ্য শুধু এশিয়া নয়, আমরা বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে দেখতে চাই।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, “বাংলাদেশের মেয়েরা জানে কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দৌড়াতে হয়। এটি দেশের জন্য গর্বের বিষয়।”
দলের কোচ পিটার বাটলার বাংলায় ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে সবাইকে মুগ্ধ করেন এবং মেয়েদের কঠোর পরিশ্রমের প্রশংসা করেন। সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হকও মেয়েদের প্রশংসা করে বলেন, “আরও পেশাদার পরিকল্পনা দরকার।”
তবে ঘরোয়া লিগ ও প্রতিযোগিতার অভাব এই সাফল্যের পাশে বড় এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। গত বছর মে মাসের পর থেকে কোনো লিগ আয়োজন হয়নি। মেয়েরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে উন্নতি করেছে, কিন্তু ঘরোয়া ভিত্তি মজবুত করার দায়িত্ব এখন বাফুফের।
রাত গভীর হলেও এই সংবর্ধনা শুধু একটি উৎসব নয়, মেয়েদের আত্মসম্মান ও ভবিষ্যৎ অঙ্গীকারের সাক্ষ্য বহন করেছে। বিজয়ের আনন্দ উপভোগ শেষে, তারা আবার লড়াইয়ের পথে রওনা দেয়। কারণ তারা জানে, তাদের পথ এখনও শেষ হয়নি।