মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে সার ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানিনির্ভর সার সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে দেশের কৃষি উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও সরকারের দাবি, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং তা দিয়ে প্রায় এক বছর চাহিদা মেটানো সম্ভব।
বাংলাদেশে সারের বড় অংশ আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আবার দেশের সার কারখানাগুলোও আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য মার্চের শুরু থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটি বন্ধ রাখা হয়েছে। বেসরকারি কাফকো সার কারখানাতেও উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে কৃষিখাতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় আপাতত সংকটের আশঙ্কা নেই। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে, শিগগিরই কারখানাগুলো চালু করা হবে। অন্তত ঘোড়াশাল কারখানা চালু হলে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৮০০ টন সার উৎপাদন সম্ভব হবে।
সরকার বিকল্প উৎস থেকেও সার ও জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন, মিশর ও রাশিয়ার মতো দেশ থেকে সার আমদানির বিষয়ে যোগাযোগ চলছে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মজুত দিয়ে দীর্ঘ সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তাই দ্রুত বিকল্প বাজার নিশ্চিত করা এবং বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা জরুরি।
বর্তমানে ফসলি মৌসুম অনুযায়ী সারের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় তাৎক্ষণিক বড় সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, বোরো মৌসুম প্রায় শেষ, তাই এখন সারের চাহিদা কম। তবে বিকল্প উৎস থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করা ঠিক হবে না, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন, যার মাত্র ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি বড় অংশ আমদানি করতে হয়। বর্তমানে দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বের জ্বালানি ও সারের বড় অংশ সরবরাহ হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যা ইরানের কারণে প্রায় এক মাস ধরে কার্যত অবরুদ্ধ। এতে বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ৪৯০ ডলার থেকে ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সারের দাম আরও বাড়বে এবং খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে। ইতোমধ্যে ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ সার সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিতে পড়েছে। গবেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, সরকার তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা উড়িয়ে দিলেও, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সার আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষি খাত চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।