ইরান যুদ্ধের জের ধরে বাংলাদেশে তেলের পাচার, কালোবাজারি ও মজুতদারির অভিযোগ জোরেশোরে ওঠার প্রেক্ষাপটে সরকার পেট্রোল পাম্প বা ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি সারাদেশে জেলা ও পুলিশ সুপারদের মনিটর করার নির্দেশনা ও মজুত ঠেকাতে নয়টি জেলায় তেলের ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করার কথা জানিয়েছে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একই সঙ্গে দেশের ভেতরে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ও তেল পাচার ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ না কমলেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের যে তীব্র সংকট দেখা যাচ্ছে তার জন্য মজুতদারিকেই বেশি সন্দেহ করা হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম বলছেন, পেট্রোল পাম্পে তেল মজুতের কোনো সুযোগ নেই এবং তারা মনে করেন সরকার চাইলে সেটি সহজে যাচাই করতে পারে।
সবমিলিয়ে ইরান যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা না থাকলেও যুদ্ধের প্রভাবে কিছু মানুষের প্যানিক বায়িং আর দাম বাড়বে এই চিন্তা করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর মজুতদারির প্রবণতার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান।
যেসব ঘটনা ধরা পড়েছে
শুক্রবার (২৭ মার্চ) জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, তেলের অবৈধ মজুত রোধে যারা সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করবেন তাদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকবে।
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘কলোবাজারিরা তেলের মজুদ তৈরি করে সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, আমি সারাদেশে জেলা প্রশাসক, এসপিদের সাথে কথা বলেছি। তারা মনিটর করছে। তবে হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার মধ্যে দুর্নীতি আছে। ব্ল্যাক মার্কেটিং হচ্ছে। সিরাজগঞ্জে ধরা পড়েছে দুটি। সারাদেশেই ধরা পড়ছে।’
ওই দিনই চট্টগ্রাম বিমানবন্দর এলাকায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩০টি ড্রামে প্রায় ছয় হাজার লিটার অবৈধভাবে মজুদকৃত ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে, যুদ্ধের শুরুর দিকে গত ৭ই মার্চ বাঁশঝাড়ের মধ্যে মাটির নিচে পানির ট্যাংক বসিয়ে ১০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল লুকিয়ে রেখে আলোচনায় এসেছিলেন নাটোরের সিংড়া উপজেলার রুবেল হোসেন নামের এক জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী।
শেরপুরের একটি আবাসিক ভবন থেকে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ১৮ হাজার লিটার তেল ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে নয় হাজার ৭৮৩ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় শনিবার (২৮ মার্চ) একটি গোয়ালঘর থেকে ড্রামভর্তি পেট্রোল উদ্ধার করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
বৃহস্পতিবার রাতে ময়মনসিংহের শেরপুরে একটি আবাসিক ভবনের নিচতলায় ২৫ হাজার লিটার জ্বালানি তেল মজুত রাখার দায়ে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই দিন টাঙ্গাইল জেলার সখিপুরে অভিযান চালিয়ে পাঁচ হাজার ১৮০ লিটার পেট্রোল ও ডিজেল জব্দ করে উপজেলা প্রশাসন।
শনিবার জামালপুরে একটি প্রতিষ্ঠানে তেল মজুত থাকার পরেও বিক্রি না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বাইকাররা। পরে তল্লাশি চালিয়ে দুই হাজার ৮০০ লিটার তেল মজুত পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এদিকে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মতো জ্বালানি তেল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ হওয়ায় এগুলো ঘরে বা অনিরাপদ স্থানে মজুত করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অবৈধ মজুতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি শনিবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় বলা হয়, জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিটি জেলায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট সক্রিয় রয়েছে। জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতকে না বলুন।
কারা মজুত করছে ও কীভাবে
এখন পর্যন্ত যে কয়টি জায়গা থেকে মজুত করা তেল উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলো ফিলিং স্টেশন কিংবা জ্বালানি তেলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের নিয়ন্ত্রণাধীন জায়গা। আবাসিক ভবনের ভেতরেই ট্যাংকি বানিয়ে কিংবা ফিলিং স্টেশনেই বিরাট পরিমাণ তেল মজুত করে রাখা হয়েছিল।
যদিও পেট্রোল পাম্প মালিকরা সেটি মানতে রাজি নন। তাদের বক্তব্য হলো, হাজার হাজার ফিলিং স্টেশন মালিকের মধ্যে হাতে গোনা দু-একটির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে।
তারা বলছেন, সব পেশাতেই ভালো খারাপ আছে। ঢালাওভাবে পেট্রোল পাম্পগুলোকে দোষ না দিয়ে যারা দুর্নীতি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে মানুষকেও উপলব্ধি করতে হবে যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হবেই।
তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে তা, হলো কোথাও কোথাও খোলাবাজারের জ্বালানি তেল হুট করেই কমে গেছে। আবার যেই ফিলিং স্টেশন এক লরি তেল দুই দিনে বিক্রি হতো সেখানে এখন তেল পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ফলে ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে এক লরি তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেই অভিযোগ উঠছে কোথাও কোথাও একই বাইক বা যানবাহন এক দিনেই একাধিকবার তেল সংগ্রহ করে সেগুলো সংরক্ষণ করছে।
বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, সারাদেশে প্রশাসনকে এসব বিষয়ে সতর্কতা দিয়ে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
মজুতদারির শাস্তি কী
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে, যে ব্যক্তি কালোবাজারে মজুত বা লেনদেনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পর পণ্য মজুত করে সংকট তৈরির ঘটনা ঘটেছিল। তখনই এই আইনটি করা হয়েছিল। এ আইনে চোরাচালান, কৃত্রিম সংকট তৈরি ও ক্ষতিকারক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত যে কাউকে সরকারের আটক করতে পারার বিধান রয়েছে।’
উল্লেখ্য, আইনটি করা হয়েছিল ১৯৭৪ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি, যার উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী কিছু কার্যকলাপ প্রতিহত করা। পাশাপাশি কিছু গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।
তবে এই আইনটিকে কালো আইন হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এ আইনের অধীনে, যে ব্যক্তি কালোবাজারে মজুত বা লেনদেনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। অথবা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। জরিমানাও করা হবে।
তবে এতে শর্ত হিসেবে বলা হয়, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি লাভ ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে মজুত করেছিলেন তবে তিনি তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সাথে জরিমানাও করা হবে তাকে। একই সাথে কালোবাজারি বা মজুত হয়েছে এমন কিছু সরকারকে বাজেয়াপ্ত করার আদেশও দিতে পারবে আদালত।
দরকার কঠোর ব্যবস্থা
ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলছেন বাংলাদেশে কোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখলেই মজুতদারি শুরু হয় এবং এখনও সেটাই হচ্ছে তিনি বলেন, ‘তেলের সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সরকার বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে তেল আনছে। প্যানিক বায়িং হচ্ছে। কারণ সরকার যা বলছে মানুষ হয়তো তাতে আস্থা পাচ্ছে না। ফলে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। মজুত ও সরবরাহ নিয়ে প্রতিদিন তথ্য প্রকাশ করলে এমনটি হতো না।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু বা বন্ধ করা, কোনোটার সাথেই বাংলাদেশের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, কিন্তু এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে পড়েছে এবং সামনে আরও হবে। কারণ তেল কম সরবরাহ হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়বে। সেটি হলে জেনারেটর দিয়ে গার্মেন্ট কারখানা চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত ডিজেল আসবে কোথা থেকে। অর্থাৎ রপ্তানিতেও প্রভাব পড়তে পারে। সে কারণেই সরকারকে আরও স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তা নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষকেও পরিস্থিতি বুঝে দায়িত্বশীল হতে হবে।’