ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরপিএলসি) তীব্র সংকটে পড়েছে। মার্চের নির্ধারিত ক্রুড অয়েল চালান সময়মতো না পৌঁছানোয় রিফাইনারিটি এখন সীমিত সক্ষমতায় চালানো হচ্ছে। স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা জরুরি মজুত ব্যবহার করে দুটি ইউনিট চালু রাখা হয়েছে, অন্য দুটি ইউনিট বন্ধ রেখে রক্ষণাবেক্ষণে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির পর নতুন চালান না আসায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মার্চ ও এপ্রিলে নির্ধারিত কয়েকটি চালান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালির জটিলতায় আটকে গেছে। তবে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে নতুন একটি চালান পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে, যার পর রিফাইনারি স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারে।
যদিও উৎপাদন কমেছে, তবে দেশে তেলের সরবরাহে ঘাটতি হবে না বলে বিপিসি দাবি করছে। পরিশোধিত তেলের ঘাটতি মেটাতে অতিরিক্ত ডিজেল ও অকটেন আমদানি করা হচ্ছে। নির্ধারিত কার্গোর বেশির ভাগই আসবে বলে তারা আশাবাদী।
বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড তেল পরিশোধন করে এবং দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের হালকা মানের ক্রুড প্রক্রিয়াজাত করতে পারে; রাশিয়া বা ভেনেজুয়েলার মতো উৎসের ভারী তেল পরিশোধন সম্ভব নয়।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে ও সক্ষমতা বাড়াতে ৩১ হাজার কোটি টাকার একটি সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে, যার মাধ্যমে বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ৪৫ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে যেকোনো ধরনের ক্রুড প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ তৈরি হবে, যা সস্তা তেল আমদানির পথ খুলে দেবে বলে বিপিসির দাবি। তাদের মতে, এতে উৎপাদন বাড়বে, আমদানি খরচ কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে।
তবে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা ও লাভজনক হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সব জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় রিফাইনারির সুবিধা সীমিত। নতুন রিফাইনারি হলে উৎপাদিত পণ্যের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে পেট্রোল, দেশে পুরোপুরি ব্যবহার করা নাও সম্ভব হতে পারে, ফলে রপ্তানির প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ নিয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পথে অনীহা তৈরি হতে পারে এবং সরকারের আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে জ্বালানি ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে এই বাড়তি সক্ষমতা উদ্বৃত্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রকল্প ব্যয় নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ২০১২ সালে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকায় শুরু হওয়া পরিকল্পনার ব্যয় বাড়তে বাড়তে একসময় ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে যায়। পরে কাটছাঁট করে ৩১ হাজার কোটিতে নামানো হয়। বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘কস্ট ওভাররান’-এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন এবং বিলম্ব, মূল্যস্ফীতি ও ডলারের দর বৃদ্ধিকে এর কারণ বলছেন। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে।
তবে বিপিসি বলছে, এটি একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। ইতোমধ্যে মহেশখালীতে এসপিএম টার্মিনাল ও পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বছরে ৪৫ লাখ টন তেল সরাসরি খালাস ও পরিবহনে সহায়তা করবে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান সংকট সাময়িক হলেও ইস্টার্ন রিফাইনারির ভবিষ্যৎ, সম্প্রসারণ পরিকল্পনার যৌক্তিকতা ও জ্বালানি নীতির দিকনির্দেশনা—সবই এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি