রাজধানীতে আয়োজিত এক অংশীজন সভায় শ্রম আইন সংশোধনের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে একদিকে শ্রমিক অধিকার সম্প্রসারণে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করা হলেও, অন্যদিকে কিছু ধারা শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা ও যৌথ দর-কষাকষির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘সলিডারিটি সেন্টার’ আয়োজিত এ সভায় শ্রম আইন সংস্কারের বিভিন্ন দিক—অর্জন, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য প্রভাব—নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর একেএম নাসিম।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের আলোচনা ও ত্রিপক্ষীয় পরামর্শের ভিত্তিতে প্রণীত সংশোধনীগুলো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার একটি প্রয়াস। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এতে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে শ্রমিক প্রতিনিধিদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব চূড়ান্ত আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সভায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, সংশোধনের মাধ্যমে গৃহশ্রমিকদের আংশিক স্বীকৃতি, ছাঁটাইকালীন ক্ষতিপূরণ বৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১২০ দিনে উন্নীতকরণ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা জোরদার এবং এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম চালুর প্রস্তাবসহ বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
তবে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে নতুন সদস্যসংখ্যার শর্তকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, শ্রমিকসংখ্যা সামান্য বাড়লেই ইউনিয়ন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সদস্য সংখ্যা হঠাৎ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে, যা সংগঠন গঠনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা তিনটিতে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে শ্রমিক প্রতিনিধিত্ব সীমিত করার ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে অনেক শ্রমিক ইউনিয়নের বাইরে থেকে যেতে পারেন এবং তাদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার কার্যত বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর ডিরেক্টর (লিগ্যাল) মো. বরকত আলী বলেন, ‘সংবিধান সংগঠিত হওয়ার মৌলিক অধিকার দিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা সীমিত করা সেই অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
বক্তারা আরও বলেন, শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে স্পষ্টতার অভাব থাকায় ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিক তালিকার স্বচ্ছতা ও যাচাইযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তারা।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ প্রক্রিয়ায় যথাযথ আলোচনা হয়নি। ‘মতামত নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কার্যকর আলোচনা হয়নি। মালিক ও শ্রমিক পক্ষ একসঙ্গে আলোচনার ভিত্তি শক্ত করতে পারলে একটি ফলপ্রসূ পরিবর্তন সম্ভব,’ বলেন তিনি।
অন্যদিকে, তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ওয়াসিম জাকারিয়া বলেন, সংশোধনীতে কিছু অসঙ্গতি রয়ে গেছে এবং সরকার এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আইন বাস্তবায়নে মালিকপক্ষ সহযোগিতামূলক ভূমিকা রাখবে।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ রেভল্যুশনারি গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি সালাহউদ্দিন স্বপন, বাংলাদেশ মুক্ত গার্মেন্ট শ্রমিক ইউনিয়ন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল আলম রাজু এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তসলিমা আখতার।