বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন বিশ্বজুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অনুপস্থিতি কি দেশটিতে কোনো শাসনতান্ত্রিক ধস নামাতে পারবে? পশ্চিমা শক্তিগুলো হয়তো লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি বা সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ মডেলের পুনরাবৃত্তি আশা করছে, যেখানে একজন প্রবল প্রতাপশালী নেতার পতন মানেই পুরো রাষ্ট্রের অরাজকতায় নিমজ্জিত হওয়া।
কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের গবেষক আলি হাশেমের বিশ্লেষণ ও ইরানের গত চার দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ইরান কোনো ব্যক্তি-নির্ভর একনায়কতন্ত্র নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত ও জটিল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।
লিবিয়া বা সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের ক্ষমতা ছিল পুরোপুরি একজন ব্যক্তির হাতে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তির ইচ্ছা ছিল বড়। ফলে নেতার পতনের সাথে সাথে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বালির বাঁধের মতো ধসে পড়েছিল।
কিন্তু ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক এমনভাবে নির্মিত যেখানে ব্যক্তির চেয়ে ব্যবস্থা বেশি শক্তিশালী। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এমন এক কাঠামো তৈরি করেন যেখানে রাষ্ট্র রক্ষা করা খোদ ইমাম মাহদির জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। এই দার্শনিক ভিত্তির কারণেই ইরান গত কয়েক দশকে কাসেম সোলেইমানি বা ইব্রাহিম রাইসির মতো শীর্ষ নেতৃত্বের আকস্মিক বিদায় সত্ত্বেও কোনো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখে পড়েনি।
ইরানের সংবিধানে নেতৃত্ব শূন্যতা পূরণের একটি নিশ্ছিদ্র রোডম্যাপ রয়েছে। ইরানের সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি সর্বোচ্চ নেতা মারা যান বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন, তবে ক্ষমতা কোনো শূন্যতায় পড়ে থাকে না। অবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠিত হয় যেখানে প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জ্যেষ্ঠ আলেম অন্তর্ভুক্ত থাকেন।
২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট রাইসির মৃত্যুর পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যেভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও পরের নির্বাচন হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে ইরানের প্রতিষ্ঠানগুলো যেকোনো আকস্মিক ধাক্কা সামলে নিতে সক্ষম, যা গৃহযুদ্ধ-কবলিত লিবিয়া বা সিরিয়ায় অকল্পনীয় ছিল।
ইরানের ক্ষমতা কাঠামোতে গার্ডিয়ান কাউন্সিল, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস ও এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল একে অপরের পরিপূরক ও তদারককারী হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে ৮৮ জন আলেম নিয়ে গঠিত অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস সবসময় সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি নির্বাচনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে। এই পদ্ধতিটি ক্ষমতাকে একক ব্যক্তির খামখেয়ালিপনা থেকে রক্ষা করেছে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি নিহত হলেও সিস্টেম তাৎক্ষণিকভাবে নতুন বিকল্প খুঁজে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল খুঁটি হলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস বা আইআরজিসি। তারা কেবল একটি সেনাবাহিনী নয়, বরং বিপ্লব রক্ষার শপথ নেওয়া একটি আদর্শিক প্রতিষ্ঠান। বেইজিং বা মস্কোর প্রতিরক্ষা দর্শনের মতো ইরানও তাদের কমান্ড চেইনকে এমনভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করেছে যে, তেহরানের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব আক্রান্ত হলেও মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অটুট থাকে। আইআরজিসি নিশ্চিত করে যেন কোনো বিদেশি শক্তি নেতৃত্বের পরিবর্তনের সময় সুযোগ নিতে না পারে।
ইরানি নেতারা তাদের ইতিহাস থেকে জানেন যে নেতৃত্বের শূন্যতা মানেই গৃহযুদ্ধ বা বিদেশি শক্তির আধিপত্য। সাফাভি বা কাজার রাজবংশের পতন তাদের শিখিয়েছে বিশৃঙ্খলা এড়াতে অভ্যন্তরীণ ঐক্য কতটা জরুরি। খামেনির মতো একজন নেতার মৃত্যু ইরানে গৃহযুদ্ধ ডেকে আনার বদলে বরং শহীদী আবেগ সঞ্চার করতে পারে। শিয়া ধর্মতত্ত্বে নেতার মৃত্যু বা শাহাদাত রাজনৈতিক পতনের কারণ না হয়ে বরং ব্যবস্থার প্রতি জনমনে আনুগত্য ও প্রতিশোধের স্পৃহা আরও বাড়িয়ে দেয়।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলা ইরানের সামরিক অবকাঠামোকে হয়তো সাময়িক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, কিন্তু এটি রাজনৈতিক কাঠামোকে ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো ইরান কোনো ভঙ্গুর রাষ্ট্র নয় যেখানে কেন্দ্রের পতন মানেই প্রান্তের বিচ্ছিন্নতা। বরং ইরানের এই জটিল প্রাতিষ্ঠানিক বুনন ঝড়ের মুখে আরও শক্তভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা রাখে। সুতরাং, শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে ইরানকে ইরাক বা লিবিয়ার কাতারে ফেলা প্রায় অসম্ভব, উল্টো এই উদ্যোগ তেহরানকে আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে পারে।