ইরান ঘিরে চলমান যুদ্ধের নতুন উত্তেজনার অংশ হিসেবে জাহাজ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সীমিত বা কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার দিকে এগোচ্ছে তেহরান।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথ বন্ধ হওয়ার বৈশ্বিক প্রভাবে বাজারগুলো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ঝুঁকি, অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা এবং এর ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতির চাপের ওপর সবাই নজর রাখছে।
এই উদ্বেগ অযৌক্তিক নয়। তবে এটি গল্পের কেবল একটি অংশ।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হলে তা শুধু জ্বালানি সংকটই তৈরি করবে না; এটি সারের সংকটও (দাম রাতারাতি বেড়ে যাবে এবং সরবরাহ কমে যাবে) তৈরি করবে; যা পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ঝুঁকি।
আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা কেবল সূর্যালোক আর মাটির ওপর চলে না, এটি প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপরও নির্ভরশীল।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন জার্মান রসায়নবিদ ফ্রিটজ হেবার এবং কার্ল বোশ তাদের ‘নাইট্রোজেন ফিক্সেশন’ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, তখন তারা কেবল বড় পরিসরে অ্যামোনিয়া উৎপাদনই করেননি; তারা একটি বিশ্বব্যাপী রাসায়নিক বিপ্লব শুরু করেছিলেন, যা আধুনিক সভ্যতা ও কৃষির ভিত্তি হয়ে আছে।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিথেন গ্যাসকে অ্যামোনিয়ায় এবং অ্যামোনিয়াকে ইউরিয়ার মতো নাইট্রোজেন সারে রূপান্তরিত করা হয়, যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নাইট্রোজেন সার।
এই সারগুলো শস্যের সেই ফলন নিশ্চিত করে, যার ওপর আজকের বিশ্ব জনসংখ্যা নির্ভরশীল।
এ ছাড়া যুদ্ধের প্রভাবে গম, ভুট্টা এবং ধানের উৎপাদনও নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য হওয়া ইউরিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবহন করা হয়।
দুটি কাঠামোগত কারণে পারস্য উপসাগর এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে। প্রথমত, এখানে বিশ্বের অন্যতম সস্তা প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায়, যা অ্যামোনিয়া উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য।
দ্বিতীয়ত, গত কয়েক দশক ধরে কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো এই অঞ্চলের দেশগুলোতে অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া উৎপাদনের বিশাল সক্ষমতা তৈরি করতে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো রপ্তানি বাজার।
ফলে বৈশ্বিক বাজারে বেচাকেনা হওয়া নাইট্রোজেন সার এবং অন্যান্য দেশে সার কারখানা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বড় অংশকেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেতে হয়।
এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে তা কেবল তেল ও গ্যাস রপ্তানিকেই হুমকিতে ফেলবে না, বরং নাইট্রোজেনভিত্তিক সার এবং সেগুলো তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদানের সরবরাহকেও বাধাগ্রস্ত করবে।
এর তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে অ্যামোনিয়া, ইউরিয়া এবং এলএনজি চালানে বিলম্ব ঘটবে। এগুলো হয়তো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা উচ্চ জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচের কারণে এগুলোর দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠতে পারে।
তবে এর গভীর প্রভাব আগামী মাসগুলোতে সারা বিশ্বের খামারগুলোতে অনুভূত হবে।
উত্তর গোলার্ধে চাষাবাদের মৌসুম শুরুর আগেই সার কেনা ত্বরান্বিত হয়। কয়েক সপ্তাহের বিলম্বও যেমন বিঘ্ন ঘটাতে পারে, তেমনি কয়েক মাসের ব্যাঘাত এক বিশাল পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
যদি চালান সময়মতো পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে কৃষকেরা কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হবেন—যেমন কীভাবে অত্যধিক চড়া দাম মেটাবেন, সারের ব্যবহার কমিয়ে দেবেন, নাকি ফসলের ধরন বদলে ফেলবেন।
ফসল যেভাবে সারে সাড়া দেয়, তাতে নাইট্রোজেনের ব্যবহারে সামান্য হ্রাসও ফলনে বিশাল বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এর ফলে লাখ লাখ টন শস্য উৎপাদন কমে যেতে পারে; যা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন হয়ে পশুখাদ্য বাজার, গবাদি পশু উৎপাদন, জৈব জ্বালানি ও শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে খাবারের মূল্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
দেশগুলোর কি নিজস্ব সরবরাহ নেই
কিছু দেশের সারের মজুত থাকলেও সারের ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা যতটা মনে হয় আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি বিরল।
উদাহরণস্বরূপ, ভারত তাদের দেশীয় ইউরিয়া সার কারখানাগুলো চালানোর জন্য পারস্য উপসাগর থেকে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ব্রাজিল তাদের সয়াবিন ও ভুট্টা উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে আমদানিকৃত নাইট্রোজেন এবং ফসফেট সারের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্র—যারা বিশ্বের বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি—আঞ্চলিক চাহিদা মেটাতে এবং দাম কমাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া আমদানি করে থাকে।
সাব-সাহারা আফ্রিকায় সারের ব্যবহার এমনিতেই অনেক কম। সারের দাম আরও বাড়লে সেখানে এর ব্যবহার আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ফলন কমিয়ে দেবে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলবে। এই ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা কেবল নাইট্রোজেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান সালফার মূলত তেল ও গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়, তাহলে জ্বালানি রপ্তানির পাশাপাশি সালফার উৎপাদনও কমে যাবে।
সুতরাং এই ধাক্কা কেবল সারের চালানই কমাবে না; বরং অন্যত্র সার তৈরির পথগুলোকেও সংকুচিত করে ফেলবে।
নীমা শোকরি জাপানের ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির ফলিত প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক।
সালোম এম এস শোকরি-কুয়েহনি জাপানের ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি এবং টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব হামবুর্গের এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত